Select Page

হেমলকের নিমন্ত্রণ -এর রিভিউ


 

হেমলকের নিমন্ত্রণঃ একুশ শতকের চোখে ক্ল্যাসিক্যাল এথেন্সঃ

প্রেম ও জ্ঞানের প্রাসঙ্গিকতা ।। গাজী নিষাদ

 

চলমান শতাব্দীতে “হেমলকের নিমন্ত্রণ” আধুনিক বাংলা সাহিত্যে এক নতুন সংযোজন যা পশ্চিম ও প্রাচ্যের সম্পর্কের ধারার মাঝে আরও এক নতুন পথ খুলে দিয়েছে। এটাকে বলা যেতে পারে পশ্চিম ও প্রাচ্যের মধ্যকার সচেতন জীবনবোধ ও ডিওটেমিক মিলনের ফসল। যেই ফসলের পিতা ও বাহক একজন বিশ্বভ্রামক বাঙালী কবি। গবেষক, গল্পকার, উপন্যাসিক, কবি, ও কূটনীতিক সুজন দেবনাথ, তাঁর এথেন্সবাসের অভিজ্ঞতা ও সূক্ষ্ম আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির এক অন্যতম নিদর্শন উপন্যাস ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’। ২০২০ সালে বইটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের অন্বেষা প্রকাশন।

এথেন্সের সক্রেটিস কমিউনিটি নামে একটি ফোরাম বইটিকে সক্রেটিস বিষয়ক সাহিত্যের ( Socratic literature) এক অনন্য সংযোজন হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সক্রেটিসের জন্মদিন উপলক্ষে ২০২০ সালের জুনে এথেন্সে সক্রেটিস কমিউনিটি দ্বারা একটি অনলাইন প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়েছিল যেখানে মিঃ সুজন দেবনাথকে তাঁর বই ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ উপস্থাপনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই ফোরাম গ্রীক পাঠকদের জন্য এই বইটিকে‘Η ΓΕΥΣΗ ΤΟΥ ΚΩΝΕΙΟΥ’ শিরোনামে গ্রীক ভাষায় অনুবাদ করার প্রস্তাব করে । ২০২১ সালে এই ফোরাম ‘সক্রেটিস এবং শাস্ত্রীয় এথেন্সের সাহিত্যে’ অবদানের জন্যে মিঃ দেবনাথকে ‘সক্রেটিস কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ড’ নামে একটি বিশেষ পুরষ্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

গল্পটি নিয়ে সক্রেটিস কমিউনিটির ড. প্রোমাকস সুবাক্কাস মন্তব্য করেন-

Undoubtedly, this is a unique and wonderful addition to the world literature on Socrates. This crispy and vivid story connects all the great men of the Greek Classical Time in a brilliant way.

লেখক প্রথমে গল্পের প্লটকে কলার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে গল্প বা উপন্যাসের মাধ্যমকে বেছে নেওয়ার পেছনে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর মতে, মানুষ গল্পজীবী প্রাণী।

“মানুষের জীবন একটা গল্প। মানুষ প্রতি মুহূর্তে গল্প বানায়। প্রয়োজনে বানায়, এমনি এমনিও বানায়। মানুষ গল্প শুনতেও ভালোবাসে। মানুষ গল্পভুক। মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি যে মানুষ কোনো বিষয়ের শুধু গল্পটুকু মনে রাখে। বাকি সবকিছু ভুলে যায়।”

তাই ইতিহাসের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল সময়কে আঁকার জন্যে তিনি গল্পকে বেছে নিয়েছেন।

[ টীকা- লেখকের যুক্তির সাথে সংযোজিত মতামত– গল্প নিজে এমন একটা ল্যান্ডস্কেপ যা গল্পের মাধ্যমেই নিজের সঠিক জায়গাটুকু খুঁজে পায়, সংগীত, কাব্য বা চিত্রকলায় নয়। আরও ব্যাপকভাবে পার্থক্য করলে-

গদ্য হলো বাস্তব আর কবিতা নাটক। যেমন, গদ্য হলো একটা unrefined আইডেন্টিটি (যেমন কোনো ব্যক্তির পার্সোনালিটি, যা সবসময় চোখে পড়ে), কবিতা হলো সেই ব্যক্তির হঠাত কোনো পার্টিতে যাওয়া সাজের মতো যা অনেকটা refined. গদ্যের নিজস্ব পরিপাটি অবস্থান আছে, আবার কবিতা নিজেকে কড়া মেকাপে আচ্ছাদিত করলেও তার ভিতরটা কাননবালার হৃদয়ের মতো tragic. কখনো গদ্য কবিতা ও কবিতা গদ্য হয়ে উঠে তখন কিছুটা এই বিষয়গুলি ভেঙে যায়৷

গদ্য চ্যালেঞ্জিং, কবিতাকে চ্যালেঞ্জ করা যায়না।” ]

বইয়ের ভূমিকায় মূল গল্পের সাথে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দেবার পর্বে লেখক গ্রীস ও এথেন্স বিষয়ে তাঁর বিগত অনুরাগ ও অনুসন্ধানের কথা স্মৃতিচারণ করেন। কীভাবে তিনি স্কুলে পড়ার সময় থেকেই গ্রীস ও এথেন্সের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন এবং প্রাচীন গ্রীক সমাজের বৃহত্তর জ্ঞানতৃষা ও মনীষীদের কথা জেনেছিলেন। এপর্যায়ে পুরো বইটির সাথে লেখক আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন এভাবে-

“সেই সময় যখন ইউরোপের সভ্যতা ছিল আঁতুড়ঘরে। আঁতুড়ঘরের নাম এথেন্স। এথেন্স শহরে মাত্র দুটি প্রজন্মে জন্ম নিয়েছিলো বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণতন্ত্র, সাহিত্যের ট্রাজেডি ও কমেডি, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র, স্থাপত্য, নৈতিকতাসহ জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রায় সব শাখা। সেই জন্মের গল্পই ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’।”

আর গল্পের সূত্রপাতের গল্পে লেখক বলেন-

“সময়টি ছিল খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম ও চতুর্থ শতক। এসময় এথেন্স এবং আশপাশের কটি শহরে জন্ম হয়েছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখা। একটি সময়ে একটি শহরে বুদ্ধিবৃত্তির এরকম সমাবেশ পৃথিবীর ইতিহাসে আর হয়নি। সেই সময়ের প্রায় আড়াই হাজার বছর পরে আমি চাকরি করতে আসলাম এথেন্সে। মাত্র এয়ারপোর্টে নেমেছি। আমার স্ত্রী নিবেদিতা বলল, ‘আচ্ছা, এখানে হেমলক কোথায় খায়?’ প্রশ্ন শুনে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। হেমলকের মতো মারাত্মক বিষ খেতে হবে নাকি! ভয়ে ভয়ে নানান প্রশ্ন করে বুঝলাম, ‘হেমলক কোথায় খায়’ মানে হলো সক্রেটিস কোন জায়গায় হেমলক পান করেছিলেন? তো খুঁজতে শুরু করলাম সক্রেটিসের হেমলক পানের জায়গাটি। সেই খোঁজ থেকেই এই বইয়ের শুরু।”

সুজন দেবনাথ উপন্যাসটি রচনা করেছেন তিনটা প্রাথমিক অনুসন্ধানকে ঘিরে।

“আমার অনুসন্ধান ছিল মোটামুটি তিনভাবে। সেই সময়টিকে পড়ে ফেলা, তারপর নিজের চোখে ঘটনার জায়গাগুলো দেখা, এরপর জটিলতা থাকলে কোনো গ্রিক বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলা। এই অনুসন্ধান থেকেই ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’। গল্পের পটভূমি খ্রিস্টের জন্মের আগের পঞ্চম শতক। বছর হিসেবে খ্রিস্টপূর্ব ৫১০ থেকে ৩৯৯ অব্দ পর্যন্ত। গণতন্ত্রের জন্ম হয় খ্রিস্টপূর্ব ৫০৮ আর সক্রেটিসের মৃত্যু হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ অব্দে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম ও চতুর্থ শতককে পণ্ডিতগণ বলেন গ্রিসের ক্লাসিক্যাল সময়। আমি এ সময়টাকে ধরতে চেয়েছি।”

পরিসর বৃহৎ হলেও গল্পের টাইমলাইন স্পষ্ট। এবার ২০২১ শতকে দাঁড়িয়ে লেখক উপস্থাপন করেছেন খ্রীস্টপূর্ব ৫১০ থেকে ৩৯৯ অব্দকে গল্পে নিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে তাঁর বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা।

“অনুভব করতে চেয়েছি সক্রেটিস কিভাবে এথেন্সের আগোরার পথে খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে কঠিন দর্শনের কথা সহজ করে বলতেন। কারা কোন আদালতে ঠিক কিভাবে বিচারের নামে হত্যা করলো সক্রেটিসকে। হেরোডটাস কোথায় বসে কোন অবস্থায় লেখা শুরু করলেন পৃথিবীর প্রথম ‘ইতিহাস’। গণতন্ত্রের মতো একটি অভিনব ব্যবস্থা কোন মানুষগুলো কিভাবে আবিষ্কার করলো। চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক হিপোক্রাটিস ঠিক কোন সময় ডাক্তারদের জন্য লিখলেন তার চমৎকার ‘হিপোক্রাটিক শপথ’। পৃথিবীর সমস্ত সাহিত্যের কাঠামো গ্রিক ট্রাজেডি আর কমেডি। এই গল্পে আমি দেখতে চেয়েছি সেই থিয়েটার, যেখানে গ্রিক ট্রাজেডি জন্ম নিয়েছিল। কথা বলতে চেয়েছি পৃথিবীর প্রথম অভিনয়শিল্পীদের সাথে। ঢুকতে চেয়েছি হোমারের অন্ধ কুঠুরিতে, সফোক্লিসের নাটক লেখার মনে, ইউরিপিডিসের ট্রাজিডির গুহায়। আমি তাদের লেখাকে তাদের মতো করে ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছি।”

লেখকের এই বক্তব্যকে এখানে যেরকম ভাবসিদ্ধ ও কল্পনামিশ্রিত অভিজ্ঞতার অনুভব মনে হয়, পরক্ষণেই তার পরের কথাগুলি প্রমাণ করে, তার চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার তুলি কতোটা সূক্ষ্ম ও বাস্তব। একইসাথে তথ্যবহুল। কারণ বইটির শিরোনাম “হেমলকের নিমন্ত্রণ” হলেও তাঁর গল্পের সীমা হেমলক ও সক্রেটিসের জীবন পেরিয়ে আরও দূরে বিস্তৃত, যেখানে এসেছে তৎকালীন এথেন্সের মানুষের জীবনাচার- বিশ্বাস- সংস্কৃতি, পরিবেশ, ও সমাজব্যবস্থা । একইসাথে এই সময়কালের আলোচিত প্রতিপাদ্য, এর বহুপ্রকাশিত জ্ঞানকলা যা বহু ব্যক্তি মনীষীর বিপুল ও সার্থক আগমনে যুগপৎভাবে পুষ্ট। তবে নিঃসন্দেহে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সক্রেটিস ও সক্রেটিসের জীবন, বলা যায়, তাকে ঘিরেই এই গল্প আবর্তিত হয়েছে। আর গল্পের ভূগোল ক্ল্যাসিক্যাল এথেন্স। traditional এথেন্স যেই সময়কালে এক নতুন যুগস্রষ্টির সম্ভাবনায় উজ্জীবিত ও আলোকিত। যেই যুগসন্ধি এথেন্সকে সভ্যতার এক পরিণত ও অগ্রসর জাতিতে পরিণত করেছিলো। সুজন দেবনাথ সেই বিকশিত মহাসমারোহকে তার উপন্যাসে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন।

লেখকের ভাষায়- “খ্রিস্ট পূর্ব ৪৭২ অব্দে ইউরোপের প্রথম ট্রাজেডি লিখেন এস্কিলাস। ট্রাজেডির নাম ‘Persia’ বা পারস্য’। মানুষ যতো সুখেই থাকুক না কেন, মানুষের অন্তরে চিরকালের একটা দুঃখ-কোঠা আছে, মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগায়। তাই বেদনার সাহিত্যই মানুষের মনে গভীরভাবে থেকে যায়। সেজন্য আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কালজয়ী সাহিত্যের প্রায় সবই আসলে ট্রাজেডি। সেই ট্রাজেডি কিভাবে লেখা শুরু করলেন এস্কিলাস, কি ছিলো তার প্রেক্ষাপট, সেগুলোই গল্পের মধ্যে নিয়ে এসেছি। এরিস্টটলের মতে, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ট্রাজেডি সফোক্লিসের ‘রাজা ইদিপাস’। রাজা ইদিপাসের কাহিনী পড়েছে আর ধাক্কা লাগেনি, এমন মানুষ পৃথিবীতে নেই। আমি মানতেই পারতাম না নিজের মাকে বিয়ে করে ফেলার মতো নির্মম আর ভয়াবহ কাহিনী সফোক্লিসের মতো একজন বিশাল লেখক কেন লিখলেন! সেই প্রশ্নটি আমার একেবারে ছোট্টকালের। এই প্রশ্নের উত্তর আমাকে কেউ দিতে পারেনি। এই গল্পে আমি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। আমি দেখতে চেয়েছি, ঠিক কখন সফোক্লিস উচ্চারণ করলেন, ‘আমি পৃথিবীতে এসেছি শুধুই ভালোবাসার জন্য, কখনই ঘৃণা করার জন্য নয়।’ প্লেটো ছিলেন একজন কবি। সক্রেটিসের ছোঁয়ায় সেই কবি প্লেটো কবিতা ছুড়ে ফেলে হয়ে গেলেন কঠিন নির্দয় দার্শনিক। তার কল্পনার আদর্শ রাষ্ট্র থেকে কবি সাহিত্যিকদের দিলেন নির্বাসন। প্লেটোর কবি থেকে দার্শনিকে বিবর্তন পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসকেই বদলে দিয়েছে। প্লেটো দর্শন না লিখলে পৃথিবীই হতো অন্যরকম। প্লেটোর এই পরিবর্তনকে আমি খুঁজতে চেয়েছি। ইউরোপে স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের বদলে যাওয়া দেখতে চেয়েছি। কিভাবে মিশরের অনুভূতিহীন ভাস্কর্য বদলে গিয়ে মানুষের মতো হলো, ঠিক কখন পাথরগুলো হাত পা বাঁকা করে আড়চোখে তাকাতে শুরু করলো, সেটি খুঁজতে চেয়েছি।”

লেখকের মতে, তাঁর উপন্যাসের কোনো চরিত্রই কল্পনাশ্রয়ী নয়৷ ইতিহাসের প্রতিটি বাস্তব চরিত্র থেকে এই গল্পের নির্যাস সংগ্রহ করেছেন। সেই সময়ের একঝাঁক সৃষ্টিশীল মানুষের জীবন ও সৃষ্টিকে তিনি একটা কাহিনীতে আনার চেষ্টা করেছেন, আর সেই কাহিনির মুখ্য চরিত্র সক্রেটিস ও তার জীবন। যার সাথে সমান্তরালভাবে এই গল্প তার পরিণতি খুঁজেছে।

“দার্শনিক প্লেটো; ইতিহাসের জনক হেরোডটাস; ট্রাজেডি নাটকের তিন পিতাসফোক্লিস, ইউরিপিডিস ও এস্কিলাস; কমেডি নাটকের জনক এরিস্টোফানিস; চিকিৎশাস্ত্রের জনক হিপোক্রাটিস; এথেন্সের গণতন্ত্র ও জ্ঞানচর্চার প্রধান পৃষ্ঠপোষক পেরিক্লিস; নারী দার্শনিক আসপাশিয়া; স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যের প্রধান শিল্পী ফিডিয়াস; সক্রেটিসের স্ত্রী জেনথিপি এবং তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু দার্শনিক ক্রিতো, চেরোফোন এবং সিমন। এছাড়া গল্পের ছায়ায় আছেন দার্শনিক পিথাগোরাস, বিজ্ঞানের জনক থেলিস এবং নগর পরিকল্পনা শাস্ত্রের জনক হিপোডেমাস।”

সক্রেটিসের জীবন বিষয়ে লেখক তথ্যের ধোঁয়াশার কথা উল্লেখ করেছেন, কারণ সক্রেটিস নিজে কিছু লিখে যাননি বরং তাকে নিয়ে লিখেছেন প্লেটো, সক্রেটিসের ছাত্র জেনোফোন এবং নাট্যকার এরিস্টোফেনিস। আর এরমধ্যে নির্ভরযোগ্য প্লেটোর রচনাবলি। তিনি তার গল্পের বাস্তবতার বিষয়ে বলেন-

” পণ্ডিতেরা মনে করেন, প্লেটো তার কিছু বইয়ে সক্রেটিসের প্রকৃত জীবন কথা লিখেছেন আর বেশির ভাগ বইয়ে প্লেটোর নিজের ধারণা সক্রেটিসের মুখে সংলাপ হিসেবে বসিয়ে দিয়েছেন। তাই প্লেটোর লেখার কোনটি সক্রেটিসের কথা আর কোনটি প্লেটোর নিজের কথা, সেটি প্লেটো ছাড়া আর কেউ বলতে পারেন না। সেজন্য প্রকৃত সক্রেটিসকে কোনভাবেই নিশ্চিত করে জানা সম্ভব নয়। সক্রেটিস সব সময়ই একটি ধোঁয়াশা। সক্রেটিসকে নিয়ে এই ধোঁয়াশাকে পণ্ডিতগণ বলেন সক্রেটিস সমস্যা। এই সমস্যাকে মেনে নিয়েই আমি মানুষ সক্রেটিসকে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। প্লেটোর রচনা ছাড়া হেরোডটাসের ইতিহাস, হোমারের ইলিয়াদ ও অডিসি, এরিস্টটলের রচনা এবং তখনকার নাট্যকারদের লেখা নাটকগুলোই সেই সময়কে বোঝার একমাত্র উপায়। এরপরে আড়াই হাজার বছর ধরে সেই সময়কে নিয়ে যারাই লিখেছেন, লেখকের নিজের কল্পনা মিশে গেছে তাদের লেখায়। সেখান থেকে শুদ্ধ কাহিনী বের করা অসম্ভব। তাই আমার কাহিনী একশভাগ শুদ্ধ বলে দাবি করবো না। তবে আমি জেনে বুঝে কোনো ভুল তথ্য দেইনি। আমি কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের জীবনকে বদলে দেইনি। একটিও কাল্পনিক চরিত্র নেইনি।”

এখান থেকে এটা বুঝা যায় যে এই উপন্যাস শুধু নিছক একটি গল্প নয়, এটি ইতিহাসের এক অসামান্য দলিলও বটে। যার কথনরীতিটা গল্পের ফর্মে ও লেখকের কল্পনাশ্রয়ী হলেও যেই গল্প থেকে উঠে আসা ঘটনাগুলি তথ্যসূত্রে প্রমাণিত। যেমনভাবে কোনো ‘শব্দ’ সৃষ্টি হয়। আমরা প্রায়ই জানিনা আমাদের ব্যবহৃত শব্দগুলির আবিষ্কারক কারা, কিন্তু এটা আমরাই, যারা শব্দ তৈরি করে। ফলে শব্দ বা বক্তব্যকে যদি আমরা এই উপন্যাসে ব্যক্তিকে ছাপিয়ে দেখি তাহলেও সেই শব্দের/পদের আড়ালে এক হেমলকপায়ী ব্যক্তি সক্রেটিসেরই জীবন উঠে আসে, সেখানে আমরা পৌঁছুতে পারি আর না পারি। সুজন দেবনাথ আড়াই হাজার বছর আগের সেই ব্যক্তি সক্রেটিসকে খুঁজেছেন, যিনি শুধু একজন শিক্ষক ( বা তৎকালীন এথেন্সবাসীদের একাংশের কথায় তরুণদের বিপথে চালনাকারী), বা দার্শনিক নন, একজন সংবেদনশীল প্রেমিক, বন্ধু, বা সর্বোপরি একজন সাধারণ মানুষ, কোনো মনীষী নয়। লেখক সেই সময়কার এথেন্সের হৃদয় ও সেই হৃদয়ের রক্তপাতকে ছুঁতে চেয়েছেন। যার রক্তিম উৎস হলো ‘সক্রেটিস’।

এরপর লেখক বেদনাভরে বলেন, “আমাকে যেটি কষ্ট দিয়েছে, সেটি হলো এথেন্সের এমন সৃষ্টিশীল সময়ে কোথাও মেয়েরা নেই। মেয়েদের প্রতি এমন অবিচার আর কোন যুগের মানুষ করেননি। আমার ধারণা মেয়েদের অংশ নিতে দেয়া হয়নি বলেই, এথেন্সের অবিশ্বাস্য সুন্দর যাত্রাটি মাত্র দুটি প্রজন্মেই শেষ হয়ে গেছে। এই বই লিখতে গিয়ে নারী চরিত্র খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু নারী ছাড়া কি সাহিত্য হয়? অবশেষে অনেক খুঁজে দুজন নারীকে নিয়েছি। একজন সে সময়ের সবচেয়ে বিদুষী নারী দার্শনিক আসপাশিয়া, আরেকজন সক্রেটিসের স্ত্রী জেনথিপি। আসপাশিয়া এই বইয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। সেই নারীবিবর্জিত জ্ঞানীদের ভিড়ে শুধু নিজের বুদ্ধি দিয়ে সময়টিকে বাজিয়েছিলেন আসপাশিয়া। আর সক্রেটিসের স্ত্রী জেনথিপির বিষয়ে আমার মনে হয় প্লেটো থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সব লেখক তার ওপর অন্যায় করেছেন। প্লেটো সারা জীবনে এক লাখের বেশি শব্দ লিখেছেন, সবগুলোই সক্রেটিসকে নিয়ে, কিন্তু জেনথিপির কথা বলেছেন মাত্র দুইটি জায়গায়। সব লেখক জেনথিপি শুধুই একজন মুখরা নারী বলেছেন। কিন্তু আমার গল্পে তিনি শুধু মুখরা নারী নন; অভিমান ও প্রেমমাখা রক্ত-মাংসের একজন নারী যে ¯স্বামীকে তীব্রভাবে ভালোবাসে কিন্তু ¯স্বামীর অবহেলা সুদে-আসলে ফিরিয়ে দিতে সারাদিন বকাঝকা করে।”

এখান থেকে তৎকালীন এথেন্সের নারীদের অবস্থা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়, যেকারণে জ্ঞানকলায় এতো সমৃদ্ধি আসার পরেও এথেন্সের এই যুগটিকে এই দিক থেকে একপ্রকার অন্ধকারাচ্ছন্নই বলা চলে। কারণ নারীর বিকাশ ছাড়া একমাত্র পুরুষের বিকাশ দিয়ে কোনো যুগকাল পরিপূর্ণ হয়না। আর সেই যুগকালের অন্তর্মিলিত সুর মহানাদে বেজে উঠেনা।

সুজন দেবনাথ গল্পে তার ব্যবহৃত শব্দের প্রবাহধারা নিয়ে মত দিয়েছেন, “ভাষার ব্যাপারে আমি এই বইয়ে অত্যন্ত সচেতনভাবে একুশ শতকের তরুণদের মুখের ভাষাটিকে প্রমিত ভাবে আনতে চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি সব যুগেই একটা প্রমিত মানদণ্ড রেখে সে যুগের মুখের ভাষাটিই সাহিত্যের ভাষা হয়ে ওঠে। এছাড়া আমার মনে হয়েছে সক্রেটিস সবসময় wit আর রসিকতা মিশিয়ে তরুণদের সাথে কথা বলতেন। সেজন্য এই বইয়ে আমি ইচ্ছে করেই এই সময়ের তরুণদের মুখের প্রাঞ্জল ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করেছি।”

“হেমলকের নিমন্ত্রণ” বইটি লেখক এমনভাবে সাজিয়েছেন যে একজন পাঠক, এটিকে অনেকগুলি ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রীয় গল্পের প্লট হিসেবে দেখতে পারেন। কেউ দেখতে পারেন ক্ল্যাসিক্যাল এথেন্সে জ্ঞানকলার বহুবিধ শাখার উৎপত্তির গল্প হিসেবে, প্রথম গণতন্ত্রের উত্থানের গল্প হিসেবে, তৎকালীন এথেন্স শহরের গল্প হিসেবে, একটা সমাজব্যবস্থার কাঠামোর পরিবর্তনের গল্প, সক্রেটিস-প্লেটো, পেরিক্লিস, আসপাশিয়া, ডিওটিমার মতো দার্শনিক, শিক্ষক, রাজনীতিকের, বা কয়েকজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প হিসেবে। বা নিছক শুধুই একটা গল্প হিসেবে। তবে যেভাবেই দেখা হোক না কেন, এর প্রতিটি ভিন্ন আঙ্গিকই একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তবে গল্পটির উল্লেখযোগ্য প্লট যে প্রেম তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। যেটা গল্পের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠক অনুভব করতে পারবেন।

“”ছোট প্রেম সংসার গড়ে আর বড় প্রেম সংসার ভাঙে। বড় প্রেম বিরহের জন্য উপযোগী, সংসারের জন্য নয়। সংসার হলো দুটি মানুষের প্রতিদিনের ঝগড়া-ঝাটি, রাগ-ক্রোধ, অভিমান মিশানো একঘেয়ে অম্ল-মধুর জিনিস। তার জন্য দরকার সাধারণ, একঘেয়ে ছোট্ট প্রেম। বড় প্রেমে এগুলো খাপ খায় না। বড় প্রেম হলো হঠাৎ উচ্ছ্বাস, যা দুজনকে ভাসিয়ে নেয়, আশেপাশের মানুষকে নাড়িয়ে দেয়। এই প্রেম দিয়ে ভালো সাহিত্য হয়, কিন্তু ভালো সংসার হয় না। এই প্রেম দুটি জীবনকে পুড়িয়ে দেয়, প্রত্যাশার আগুনে জ্বালিয়ে দেয় সংসার। হেলেন আর প্যারিসের প্রেমে পুড়ে যায় ট্রয় নগর। বড় প্রেম কোন কিছুকে ধরে রাখে না, ধরে রাখে ছোট প্রেম। তাই অনেক আশা নিয়ে শুরু হওয়া বড় বড় প্রেমের সংসার সুখী হয় না, সুখী হয় ছোট প্রেমের সংসার।

ছোট প্রেম নিজে ছোট বলে অন্যায় রাগ-ক্রোধকে জায়গা দিতে পারে, আর জায়গা দিতে দিতে ছোট প্রেমের ব্যক্তিত্ব বড় হয়ে ওঠে, সে সেক্রিফাইস করতে শিখে যায়। আর বড় প্রেম নিজে বড় বলে একটি ছোট্ট অভিমানকেও জায়গা দিতে পারে না, ছাড় না দিতে দিতে বড় প্রেমের ব্যক্তিত্ব ছোট হয়ে যায়, সেক্রিফাইস কি জিনিস সেটাই ভুলে যায়। তাই ছোট প্রেম সংসার গড়ে আর বড় প্রেম সংসার ভাঙে।”

এভাবে গল্পের অগ্রগতির সাথে আমরা দার্শনিক সুজন দেবনাথেরও দেখা পাই, যেখানে গল্পের এক নিভৃত পর্যবেক্ষক হিসেবে তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার অনুসন্ধিৎসু চিন্তা ও গভীর দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ রেখে গেছেন।

 গল্পের স্থানগুলি এতো জীবন্তভাবে বর্ণিত হয়েছে যে চোখে গ্লাভস পরে সীটবেল্ট বেঁধে নিয়ে অনায়াসে একটা টাইম ট্রাভেল করা যায়। আড়াইহাজার বছর আগের এথেন্স নগরী। এথেন্সের আগোরা, সিমনের জুতার দোকান, আসপাশিয়া ও পেরিক্লিসের বাড়ি, শহরের একটা পাড়া এলোপেকি, আপনমনে রাস্তায় হেঁটে চলা সক্রেটিস। তার সাথে প্রিয় বন্ধু ক্রিতো। দূরে দেবী এথিনার মন্দির। আর এই পথ ধরেই একদিন হিমশীতল কারাকক্ষ, যেখানে সক্রেটিসের জন্যে অপেক্ষমাণ এক পেয়ালা হেমলক। আর সেইসাথে একটা যুগের সমাপ্তি এবং এক নতুন যুগের সূচনা।

লেখকের অপরিসীম মনোযোগ, পরিশ্রম আর কাব্যিক স্পর্শ একটা বিপুল সময়ের ফ্রেমকে জীবন্ত করে তুলেছে পাঠকের সামনে। একইসাথে লেখক খোঁজ করেছে সক্রেটিস বিষয়ে বিজ্ঞ বর্তমান সময়ের দুর্লভ কয়েকজন ব্যক্তিকে( যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য এভমিখানোস মোসকোনাস , বর্তমান এথেন্সে যিনি সক্রেটিসের সময়ের ডায়ালেক্টে কথা বলতে পারা একমাত্র জীবিত মানুষ), তারসাথে খুঁজেছে সেই যুগকালের সাথে এই যুগকালের রেখাকে, সমসাময়িক বিশ্বনীতি ও নান্দনিকতাকে, সর্বোপরি যাকিছু জীবন ও সংসার থেকে উঠে আসে-তাকে।

গাজী নিষাদ (গাজী ফজলে রাব্বি)
শান্তিনিকেতন
gazinishad7@gmail.com

 


 

আমি এতদিন যা খুজছিলাম, তা এই বই।
আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বই এটা –
‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ – রিভিউনামা : শুভ আসাদ

এ বই পড়া শুরু করতেই আমি প্রবেশ করি গ্রীসের এথেন্সে। আমি মহান সক্রেটিস এর পেছনে ঘুরতে থাকি। সক্রেটিস যেখানেই যায় আমিও ছায়ার মত সেখানেই যাই। উদ্ভ্রান্ত এক যুবকের পেছনে এথেন্সের অলিগলিতে যেতে থাকি আমি। উনি যাই বলেন তাই শুনেই মনে হয়, এভাবে তো কেউ কখনো বলেনি, এভাবেতো কেউ ভাবেনি।

উনি মানুষকে প্রশ্ন করে অনবরত। প্রতিটা জিনিস বেরিয়ে আসে উনার প্রশ্ন প্রশ্ন খেলাতে। উনার জ্ঞান, প্রশ্ন প্রশ্ন খেলাতে আকৃষ্ট হয়ে তরুনরা দলে দলে যোগ দেয়, একই সাথে তার বাড়তে থাকে তাকে অপছন্দ করা মানুষ। এই পছন্দ করা আর অপছন্দ করা মানুষের একটা সম্পর্ক আছে। একটা বাড়লে আরেকটা তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে। এর পেছনের কারন মানুষের ঈর্ষাকাতরতা।

সক্রেটিস জীবনের শুরুতে সবাইকে বলে বেড়ায়, নিজেকে জানো। এর মাধ্যমেই জানতে পারবে পুরো দুনিয়াকে। এই বাক্যের গভীরতা অনুধাবন করতে আপনাকে গভীরভাবে ভাবতে হবে।

সেসময় এথেন্স হয়ে উঠে জ্ঞানীদের রাজ্য। চারদিকে জ্ঞানের চর্চা। পৃথিবীর সকল জ্ঞানের শাখা-প্রশাখাগুলো গুলো তখন আবিস্কার হচ্ছে। সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, নাটক এর আবিস্কার হয় তখন। একই সাথে গনতন্ত্রের সুচনা। চারদিকে গনতন্ত্রের জোয়ার। গনতন্ত্রের সুবিধাভোগ করছে গ্রীসের এথেন্সবাসী।

সক্রেটিস এত চর্চার মধ্যে বের করলো, তার চর্চার বিষয় হচ্ছে, মানুষ। মানুষ নিয়ে তিনি ভাববে। মানুষের সুন্দর জীবন নিয়ে তিনি ভাববে। কিভাবে মানুষের জীবন সুন্দর করা যায় এই নিয়েই তার ভাবনা, এই নিয়েই পথে পথে তার আলোচনা। মানুষ পাগলের মত ভালোবাসছে তাকে। শত শত শিষ্য হচ্ছে। পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে সক্রেটিস এর ভাবনা।

ভালোবাসার তিনটি স্তর। প্রথম স্তরে হচ্ছে, মানুষের সৌন্দর্যের প্রতি ভালোবাসা। দ্বিতীয় স্তরে হচ্ছে, মানুষের মনের প্রতি ভালোবাসা, এবং সর্বশেষ স্তরে হচ্ছে জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা। জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসাই হচ্ছে মানুষের জীবনের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ভালোবাসা।

এরকম হাজারো জীবনদর্শন রয়েছে বই এর প্রতিটি পেজে। রয়েছে সেসময় দেবদেবীদের নিয়ে মিথ। হোমারের মহাকাব্য নিয়ে বিশ্লেষণ। ওডিসি, ইদিপাস নিয়ে আলোচনা।

সেসময় এথেন্স কে সারা পৃথিবীর সেরা বানায় গনতন্ত্রের নেতা পেরিক্লিস। স্থাপত্য, জ্যামিতি, মূর্তির সুচনা উনার হাত ধরে। অলিম্পিক শুরু হওয়ার কাহিনী বর্নিত আছে এই বই এ।

যুদ্ধের ভয়াবহতা আছে, প্লেগ রোগে পুরো রাজ্য শেষ হওয়া এবং সেখান থেকে চিকিৎসা বিদ্যার পথিকৃত হিপোক্রাটিস এর অবর্ননীয় সংগ্রামের মাধ্যমে প্লেগ রোগকে নিয়ন্ত্রণ এর গল্প আছে এ বই এ।

সক্রেটিস এর প্রধান শিষ্য প্লেটোর গল্প আছে এখানে। কতোটা পাগল ছিলেন তিনি সক্রেটিস এর, সে ব্যাপারে বলা হয়েছে।

হিংসে, ঈর্ষাকাতরতার জন্য পৃথিবীর অমুল্য সম্পদ সক্রেটিস এর জীবন দেওয়া। এবং জীবন দেওয়ার সময়ও তার নীতিতে অবিচল থাকা নিয়ে লেখক অসাধারণ ভাবে লিখেছেন এই বই এ।

বই এর প্রতিটা পাতায় রয়েছে জীবনদর্শন, ইতিহাস। রয়েছে ভালোবাসার গল্প।

দর্শন নিয়ে যার বিন্দুমাত্র আগ্রহ রয়েছে তাদের জন্য এ বই একটা মধু।

আমার অতি ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয়েছে, আমি এতদিন যা খুঁজছিলাম, তা এই বই। আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বই এটা।

 


 

বইয়ের নাম: হেমলকের নিমন্ত্রণ
লেখক: সুজন দেবনাথ
(কথাসাহিত্যিক, কবি ও কূটনীতিক)

নাবিলা খান
প্রভাষক, কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ

সক্রেটিসের বিধবা মা সক্রেটিসকে শুধু দুটি কাজ করতে বলেন – সক্রেটিসের বাবার শুরু করা মূর্তিগুলো শেষ করতে হবে আর তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে হবে। এই দুটি কাজের মধ্যে দ্বিতীয় কাজটিকেই সহজ ভেবে সক্রেটিস বিয়ে করতে রাজি হল।
সক্রেটিসের জন্য পাত্রী পাওয়া সহজ ছিল না। সে এথেন্সের সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ হলেও বিয়ের বাজারে জ্ঞানের কোন দাম নেই। সক্রেটিসের মা সক্রেটিসের জন্য মেয়ে ঠিক করল। যে সবাইকে হুকুম দেয়, বকাবকি করে আবার আনন্দে চুপিচুপি কান্না করে! একেবারে নারিকেল স্বভাব। ভেতরে টলটলে পানি, আর বাইরে ভীষণ শক্ত। মেয়েটির নাম জেনথিপি। মানে হলুদ রঙের ঘোড়া। সক্রেটিসের মা ভাবল – সক্রেটিসের জন্য এরকম একটি ঘোড়াই দরকার। শক্ত মেয়ে না হলে সক্রেটিসকে নিয়ে সংসার করতে পারবে না।

(গ্রিকরা বিয়ের প্রস্তাব দেয় আপেল দিয়ে। কোন মেয়েকে পছন্দ হলে, তার দিকে আপেল ছুঁড়ে দেয়। যদি মেয়েটি আপেলটি ধরে মিষ্টি হাসি দেয়, মেয়েটি রাজি। আর আপেল না ধরলে মেয়েটি রাজি না।)

এক সুন্দর বিকেলে জলপাই বাগানে, সক্রেটিস আপেল হাতে তাকিয়ে আছে জেনথিপির দিকে। জেনথিপি তাকালো সক্রেটিসের দিকে। তার বুক কাঁপছে। এই লোক তো জ্ঞানী, প্রেমিক না। এর হাতে আপেল কেন? সে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে!
সেদিন জলপাই বাগানে আপেল ছুড়তে পারেনি সক্রেটিস। তবুও ৩৭ বছরের সক্রেটিসের সঙ্গে ১৩ বছরের জেনথিপির বিয়ে হয়ে গেল।

সারাদিনের আনুষ্ঠিকতার ক্লান্তিতে জেনথিপি রাতে ঘুমিয়ে গেল। সেই ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে সক্রেটিস প্রতিজ্ঞা করল, এই মেয়েটির সাথে সে কোনদিন খারাপ ব্যবহার করবে না। মেয়েটি কিছু বললে, সে রাগ করবে না। ওর সব রাগ-অভিমান মুখ বুজে সহ্য করবে।

বিবাহিত জীবন মানুষের এক নতুন অভিজ্ঞতা। সক্রেটিসের বউ চায়, সে ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরুক, বাজার করুক, খুনসুটি করুক। এর কোনোটাই সক্রেটিসের পছন্দের কাজ না।

বিয়ে করে বিপদে পড়েছে সক্রেটিস। এখন তার জন্য একটি মেয়ে অপেক্ষা করে। সারাদিন তার কথা মনে করে সন্ধ্যা হলে একটু পরপর দরজার দিকে তাকায়। মেয়েটিকে সুখে রাখতে হবে। তার মন রেখে চলতে হবে। সেই মেয়েটির কিছু জিনিস পছন্দ হয়, আবার কিছু জিনিস পছন্দ হয় না। কিন্তু পছন্দ না হলেও মানিয়ে নিতে হবে। পালানোর উপায় নেই।

সক্রেটিস বুঝে গিয়েছিল – আদর্শ স্বামী সে হতে পারবে না। তবে বিয়ের রাতে যে শপথ সে নিয়েছে, সেটা সে মানে। সে জেনথিপির কথা মুখ বুজে শোনে। কথা ভাল লাগলে জবাব দেয়। না লাগলে চুপ থাকে। কোনদিন জেনথিপির সাথে রাগ করে না।

জেনথিপি স্বামীর যে ছবি ছোটবেলা থেকে কল্পনা করেছে, সক্রেটিস কোনোভাবেই সেরকম না। বিয়ের আগে আপেল হাতে সক্রেটিসকে দেখে যে মধুর সুর তার মনে এসেছিল, সেই সুর সবসময় শুনতে চায় জেনথিপি। যে করেই হোক দুই জীবনকে এক করে সুখী দাম্পত্য চাই। সেই উদ্দেশ্যে জেনথিপি স্বামীর জন্য যে অস্ত্র ঠিক করেছে, সেই অস্ত্রের নাম – ঝাড়ি অস্ত্র। সে সারাদিন ঝাড়ি দেয়, উঠতে-বসতে বকাঝকা করে। ফলাফল হয়েছে সক্রেটিসও আদর্শ স্বামী হয়নি, জেনথিপিও হতে পারেনি আদর্শ স্ত্রী। সক্রেটিস হয়ে গেছে সংসার বিমুখ, আর জেনথিপির পরিচয় সে এক মুখরা নারী।

তারা দুজনেই দুজনকে ভালবাসে। কিন্তু কেউ কাউকে বোঝার চেষ্টাই করেনা। তাই তাদের সংসারে সকাল-বিকাল চিৎকার। চিৎকার জেনথিপি একাই করে। সক্রেটিস শুধু শোনে।

এ চেঁচামেচিতে সক্রেটিসের মায়ের সমর্থন আছে। সে জানে সক্রেটিসকে পথে রাখতে বউকে শক্ত হতে হবে। তাই মা বউকে চালানোর কৌশল থেকে জমি জমার হিসাব, টাকা-পয়সার হিসাব সবকিছু শিখাচ্ছেন।

জেনথিপি সক্রেটিসের জন্য নিজের হাতে কাপড় বোনে।সারাদিন ধরে সক্রেটিসের জন্য রান্নাবান্না করে খাবার নিয়ে বসে থাকে। কিন্তু সক্রেটিসের দেখা নেই। খাবার নিয়ে বসে থাকতে থাকতে যখন তার মাথা ভীষণ রকম গরম হয়ে যায়, তখন সক্রেটিস বাড়ি ফেরে। তখন আর সক্রেটিসের কপালে খাবার জোটে না, জোটে রাশি রাশি গালি!

এই জীবনে সক্রেটিস সুখী। সংসার নিয়ে সক্রেটিসের কোন অভিযোগ নেই, কোন কষ্ট নেই। কিন্তু জেনথিপি মানতে পারেনি। তাই সে কষ্ট পায় আর গালাগালি করে।

কিন্তু সক্রেটিস জানে জেনথিপির ভালোবাসা তীব্র, তাই রাগও বেশি, সেজন্যই বকা ঝকা মাত্রাহীন। সে বন্ধুদের হাসিঠাট্টায় বুঝিয়ে দেয় যে জেনথিপিকে সে ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে।

জেনথিপিও স্বামীর গর্বে, গর্ব অনুভব করেন। তাইতো পার্থেননে সক্রেটিস সবাইকে যখন মূর্তি এবং ভবনগুলোর বর্ণনা দিচ্ছিল সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। স্বামীর গরবে গরবিনী হলে যে এতো ভাল লাগে তা জেনথিপি এতদিন জানতো না। আবার সক্রেটিসও বলেন আমার সংসারের পুরো বোঝা জেনথিপির মাথায়।

এথেন্সে যখন প্লেগের আক্রমণ বেড়ে গেল তখন সক্রেটিসের বন্ধুরা সক্রেটিসকে নিয়ে থেসালী নগরে যাবে ঠিক করল। কিন্তু সক্রেটিস রাজি না হওয়ায় তারা জেনথিপির কাছে গেল সক্রেটিসকে রাজি করাতে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে জেনথিপি বলল সক্রেটিস সবচেয়ে ভালো বোঝে, আমরা এখানেই থাকবো।

জেনথিপির ভালোবাসার অনেক শক্তি। তিনি নিজের হাতে সক্রেটিসকে নতুন কাপড় পড়িয়ে, চুল আঁচড়ে দিয়ে, পায়ে চটি পড়িয়ে সিম্পোজিয়ামে পাঠান। যদিও সক্রেটিস বলেন, তোমার মান রাখতে আমি সেজেগুজে সিম্পোজিয়ামে যাচ্ছি। তোমার জন্য আমি সব করতে পারি। শুধু একটা অনুরোধ সক্রেটিসকে বদলে ফেলো না।

সক্রেটিস জেনথিপির সাথে মজাও করতেন। একবার থেসালীর রাজা সক্রেটিসকে সস্ত্রীক দাওয়াত দিলেন। জেনথিপিও খুবই আগ্রহী হলো সেখানে গেলে সচ্ছলতা আসবে এইভেবে। কিন্তু যখন সক্রেটিস বলল সেখানকার মেয়েরা সুন্দর! তখন জেনথিপি চিৎকার দিয়ে বললেন, চুলোয় যাক তোমার টাকা-পয়সা। সেখানে তোমার যাওয়া হবেনা। সক্রেটিস মনে মনে হাসছেন।
সক্রেটিস-জেনথিপি দম্পতির তিন সন্তান। গ্রীসের নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম সন্তান ছেলে হলে নাম রাখা হয় বাবার বাবার নামে। কিন্তু সক্রেটিস জেনথিপির প্রতি সম্মান জানিয়ে তার ছেলের নাম রাখলেন জেনথিপির বাবার নামে, লেমপ্রোক্লিস। স্বামীর এ উদারতায় জেনথিপি মহাখুশি‌, সে জানে তার স্বামী অত্যন্ত বড় মনের মানুষ। আর তাদের দ্বিতীয় ছেলের নাম রাখলেন সক্রেটিসের বাবার নামে, সফ্রোনিকাস।

সক্রেটিসের বিরুদ্ধে যখন মামলা হল খবর শুনে জেনথিপি পাগলের মতো করেছেন। সক্রেটিসের বিপদে সেই মুখরা মেয়েটিই বুক আগলে সক্রেটিসের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সক্রেটিসের সংসার দেখে প্লেটো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে জীবনে বিয়ে করবে না। কিন্তু সক্রেটিসের বিপদে সক্রেটিসের প্রতি জেনথিপির ভালোবাসা দেখে ভাবল বউ জিনিসটা মনে হয় এত খারাপ কিছু না!
কারাগারে জেনথিপি সক্রেটিসকে নিজ হাতে খাইয়ে দেয়। সক্রেটিস জেলখানায় বসে জেনথিপির জন্য কবিতা লেখেন। জেনথিপি মহা খুশি। তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। সব কান্নার কারন হয়না।

সক্রেটিসের হেমলক পানের আগের রাতে সক্রেটিস ও জেনথিপি জেলখানায় সারারাত গল্প করে; সমস্ত না বলা কথা, প্রশ্ন সমাধান করে নেয়।

একবার লোকে ছড়িয়ে দিল যে সক্রেটিস দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। আসলে তেমন কিছু ঘটেনি। সক্রেটিস একথা জেনথিপিকে জানাতেই জেনথিপি বলেন যে, সে জানে সক্রেটিস দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। নিজেই সরে এসেছিলেন। তবুও সক্রেটিসের মুখ থেকে শুনে ভালো লাগলো। তার মনে মনে অনেক দিনের একটা চিনচিনে ব্যথা ছিল। সেটা চলে গেল।
জেনথিপি ভাবে, তিনি আসলে সারা জীবন সব কিছুতেই সক্রেটিসের সাথে অভিমান করে গেছেন। তাই দাম্পত্যের অনেক কিছুই উপভোগ করতে পারেননি। জেনথিপি কাঁদছেন।

আর সক্রেটিস ভাবছেন- সারা জীবন এই মেয়েটিকেই শুধু কষ্ট দিয়েছেন। দুনিয়ার সব মানুষের জন্য সুন্দর জীবন খুঁজেছেন। শুধু জেনথিপিকেই দিয়েছেন একটি অসুন্দর জীবন। সক্রেটিসেরও কান্না পাচ্ছে। দুজন দুজনের জন্য কাঁদছেন। রাত বয়ে চলেছে…!

জেনথিপি বারবার বাইরে তাকাচ্ছেন। তার ভয়- কখন যেন আকাশ ফর্সা হয়ে যায়! রাত্রি শেষ হয়ে যায়। তিনি জোড় করে সক্রেটিসকে ঘুম পাড়াতে চাইছেন। তাদের বিয়ের প্রথম রাত জেগেছিলেন সক্রেটিস। আজ শেষ রাত। সক্রেটিস ঘুমাক। জেগে থাকবেন জেনথিপি।

সক্রেটিসকে নিয়ে লেখা হলে সে লেখায় জেনথিপি থাকবেই। জেনথিপিকে বাদ দিয়ে সক্রেটিসকে নিয়ে লেখা যাবে না। কিন্তু সক্রেটিসের বউ কে এমন ভাবে তুলে ধরা হয় যেন তার চরিত্র ভয়ংকর। সে সারা জীবন শুধু সক্রেটিসকে জ্বালিয়েছে।
যেমন, একবার তিনি সক্রেটিসের মাথায় পানি ঢেলে দিয়েছিলেন উত্তেজিত হয়ে। সক্রেটিস তখন বলেন “গর্জনের পরেই নামে বারিধারা (After thunder comes the rain)।

আবার সক্রেটিসের প্রচলিত বাণীগুলোর মধ্যে একটা বাণী এরকম- “যদি বউ ভাল হয় তাহলে তুমি পাবে একটি সুন্দর জীবন, আর যদি বউ খারাপ হয়, তুমি হবে একজন দার্শনিক।” এজন্যও মনে হতে পারে, সক্রেটিসের বউ দজ্জাল!
ইংরেজি অভিধানে Xanthippe শব্দের অর্থই “a scolding or ill – tempered wife; a shrewish woman”!

কিন্তু বন্ধুরা যখন সক্রেটিসকে তার বউ নিয়ে কথা তুলতো তখন সক্রেটিস জবাব দিয়েছে যে, জেনথিপির তর্ক করার স্পিরিট এর জন্যই সে তাকে পছন্দ করেছেন। সক্রেটিস বলেন- জেনথিপি মানে হলুদ ঘোড়া। ঘোড়া যদি আনতেই হয় এমন ঘোড়া আনলাম, যে ঘোড়া সামলানো সবচেয়ে কঠিন। এখন আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, যখন জেনথিপি নামের ঘোড়াটিকে সামলাতে পারছি, আমি দুনিয়ার যেকোন ঘোড়াকেই সামলাতে পারবো।

জেনথিপির স্বামীর প্রতি রাগ দেখানোর যথেষ্ট কারণ ছিল বলা যায়। তার ঝাঁঝ হয়ত বেশি ছিল। কিন্তু যেভাবে তাকে কলহপ্রিয়, বদমেজাজি, স্বামী নির্যাতনকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়, হয়তো তিনি তেমন ছিলেন না। জেনথিপি ছিল একটি বাস্তব চরিত্র। বইটি পড়ে জেনথিপিকে নিয়ে আমার বহুদিনের ভুল ধারণা দূর হলো।

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ একটি অসাধারণ, মনোমুগ্ধকর বই।বইটির পটভূমি খ্রিস্টের জন্মের আগের পঞ্চম শতক। উপন্যাসটির কোন চরিত্রই কাল্পনিক নয়। দার্শনিক সক্রেটিস কেন্দ্রীয় চরিত্র। অন্যান্য চরিত্র গুলো হচ্ছে দার্শনিক প্লেটো, ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস, সফোক্লিস, ইউরিপিডিস, চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক হিপোক্রটিস, পেরিক্লিস, ভাস্কর্য শিল্পী ফিডিয়াস, দার্শনিক আসপাসিয়া, জেনথিপিসহ আরো অনেকে। বইটি পড়া শুরু করলে শেষ না করে উঠতে মন চাইবে না। আর শেষ হলে মনে হবে কেন শেষ হলো?! পড়ার সময় বিভিন্ন অপরিচিত শব্দের ফুটনোটও বইটিতে দেয়া আছে। আছে গ্রীক মিথোলজি। অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় লিখিত প্রচুর তথ্যবহুল এই বইটি জ্ঞান ভান্ডার সমৃদ্ধ করবে এটা নিশ্চিত।

// নাবিলা খান
প্রভাষক, কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ

 


 

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ নিয়ে সাহিত্যিক বাদল সৈয়দ

 


 

বুক রিভিউ-“হেমলকের নিমন্ত্রণ” ।। তারেক রহমান

রিভিউ লেখার আগে একটা কথা বলে নিই। বইটি পড়ে আমার খুব আফসোস হয়েছে আমার কেন টাকা নাই। টাকা থাকলে আমি গ্রিসে ঘুরতে যেতাম। দেখে আসতাম প্রাচীন সেই গ্রিক নগরীর স্থাপনা। জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শনের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। এথেন্স ও স্পার্টা নগরী। কিন্তু আফসোস!!! আজ গরিব বলে সেটা সম্ভব নয়। (আমি গরীব, আমার বন্ধু বান্ধবও গরিব) আপনারা যারা বইটা পড়বেন আশা করি আপনাদেরও একই রকম অনুভূতি হবে। বইটা পড়বেন আর মনে মনে ভাববেন আপনি বোধহয় গ্রিসেই আছেন। আপনার সামনেই রয়েছে এথেন্স নগরী, স্পার্টা নগরী। এথেন্সের আগরা, সক্রেটিসের বাড়ি, পেরিক্লিসের বাড়ি, সিমনের জুতোর দোকান। দেবী এথিনার মন্দির। (দেবী এথিনার নাম থেকেই এথেন্স।)

১. প্লেটোর বই দ্য রিপাবলিক। সেখানে তিনি আদর্শ নগর এর কথা বলেছেন। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের কোন কবি সাহিত্যিকদের স্থান নেই। কারণ কমেডি নাটকের জনক এরিস্টোফেনিস সক্রেটিস কে আক্রমণ করে একটা প্রহসন লিখেছেন নাম “মেঘ” (The Clouds). এই নাটকে সক্রেটিসকে বিভিন্ন মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়। জনগণের সামনে সক্রেটিসকে বানানো হয় ভিলেন এবং তরুণ সমাজকে পথভ্রষ্টকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেই ক্ষোভ থেকে প্লেটো তার সব নাটক কবিতা পুড়িয়ে দিয়ে কবি থেকে হয়ে যান কঠিন দার্শনিক। অথচ প্লেটো জন্মের সময় সবাই বলেছিল এই ছেলে একদিন হোমারকে ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু হায়!! বিশ্ববাসী কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক প্লেটোকে হারিয়ে ফেলল।

২. সক্রেটিসের বন্ধু ছিল ক্রিতো। ক্রিতো সক্রেটিসের সাথে মিশতো বলে তার বাবা তাকে শাসন করতো। শাসন করার সময় লাঠি হাতে তাত করত মহাকবি হোমার এর কবিতা। কবিতার দুটো লাইন- “কুপিতার সুপুত্র নাহি হয় ভবে; পিতা যদি ভাল হয়, পুত্র ভালো হবে।”

৩. গ্রিসের সবারই হোমারের “ইলিয়াড” এবং “ওডিসি” মহাকাব্যের কাহিনী মুখস্থ। বইতে লেখক “ইলিয়াড” এবং “ওডিসি”র কিছু কাহিনী এনেছেন। আমরা সবাই মোটামুটি “হেলেন অফ ট্রয়” মুভিটা দেখেছি। যেটা মূলত হোমারের ইলিয়াড মহাকাব্যের চলচ্চিত্ররূপ। তবে হোমারের ইলিয়াড এবং ট্রয়ের কাহিনী সামান্য একটু ভিন্ন। হোমারের ইলিয়াড মহাকাব্যের একিলিসকে তার বাবা বলেছিলেন–  “সময়ের সেরা হও

প্রতিদিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাও

বিপদের ভয়ভরা রাতে সাহস বিছিয়ে দাও

পথ কঠিন? নিজের পথ তৈরি করে লও।”

গ্রিসের সবাই নিজেকে মহাবীর একিলিস ভাবেন। 

৪. প্রাচীন গ্রিসে মার্চ মাসের শুরুতে এথেন্সে দেবতা ডিওনিসাস এর উদ্দেশ্যে একটি উৎসব হত। একে ডিঅনিসাস  উৎসব বা বসন্ত উৎসব বলা হতো। এই উৎসবে ট্রাজেডির প্রতিযোগিতা হত। নাটক লিখতেন ইউরিপিডিস, একিলাস, সফোক্লিস, থেসপিস। একবার বসন্ত উৎসবে থেসপিস প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হলো। তাকে পুরস্কার দেওয়া হল একটি ছাগল। যেটি দেবতা ডিওনিসাস কাছে উৎসর্গ করা হল। ছাগলকে গ্রীকরা বলে ট্রাগোস আর গান কে বলে অডি। ট্রাগস আর অডি মিলে হলো ট্রাজেডি। নাট্যকার ইউরিপিডিস ছিলেন সক্রেটিসের বন্ধু। সক্রেটিস শুধু ইউরোপের নাটক দেখতেই মঞ্চে যেতেন। একবার নাটক দেখতে গিয়েই সক্রেটিসের সাথে পরিচয় হয় আসপাসিয়ার। আসপাসিয়া ছিলেন বিশ্বের প্রথম নারী দার্শনিক ও সক্রেটিসের শিক্ষক ও বন্ধু।

৫. নাট্যকার একিলাসের তিনটি নাটক– প্রমিথিউস বন্দি,  প্রমিথিউস মুক্ত আর অগ্নিরথ প্রমিথিউস। দেবতা জিউস সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। পৃথিবীতে কোন মানুষ থাকবে না। জিউসের হুকুম মেনে নিল সব দেবতার। শুধু একজন মানলো না। তার নাম প্রমিথিউস। সে মানুষকে নিশ্চিহ্ন হতে দেবে না। এত বড় অন্যায় সহ্য করবেন না। সে রাতের আধারে আগুন চুরি করল। আগুন নিয়ে গেল মানুষের কাছে। মানুষকে শেখালো আগুনের ব্যবহার। শুধু আগুন নয়, সে মানুষকে আরো অনেক কিছু শেখাল। কৃষিকাজ, লেখা, গণনা সব কিছু শেখাল। মানুষ হয়ে গেল ক্ষমতাবান। দেবতাদের মাতাব্বরি শেষ  এই খবর শুনে জিউস বন্দী করল প্রমিথিউসকে। তার শাস্তি তাকে ককেশাস পাহাড়ে শিকল দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হবে।

জিউসের হুকুমে তাকে বন্দী করেছে তিনজন- একজনের নাম “ক্ষমতা” একজন হলো “শক্তি” আর তৃতীয়জন হল দেবতা হেফাস্টাস। তিনজনের মধ্যে “ক্ষমতা” আর “শক্তি” খুবই নিষ্ঠুর। কিন্তু শিল্পী হেফাস্টাস নিষ্ঠুর না। প্রমিথিউসকে বন্দী করতে এসে হেফাস্টাস বললেন- জিউস নিষ্ঠুর। সে নতুন ক্ষমতা পেয়েছে। ক্ষমতার ধর্ম হল–  *নতুন নতুন ক্ষমতা পেলে সবাই নিষ্ঠুর হয়ে যায়।”

প্রমিথিউসের বন্ধু মহাসাগরের দেবতা ওশান (Ocean). নাটকের একটি চরিত্র হলো আইও। সেও জিউসের নিষ্ঠুরতার শিকার। সেই মেয়ে আইও ছুটে এলো প্রমিথিউসের কাছে। সে নিজের কাহিনী বলল। প্রমিথিউস বিরাট জ্ঞানী। সে অতীত, ভবিষ্যৎ সব দেখতে পায়। সে বলল তুমি ছুটতে ছুটতে যে সাগর পার হয়ে এসেছ একদিন সেই সাগরের নাম হবে আইওনিয়ান সাগর।  এথেন্সের পূর্বদিকে সেই আইওনিয়ান সাগর অবস্থিত।

প্রমিথিউস বলল-আইও তুমি ষাঁড়ের রূপেই সাগর প্রণালী পার হয়ে ইউরোপ থেকে মিশরে চলে যাবে। ষাঁড়ের রূপে তুমি প্রণালীটি পার হবে বলে এর নাম হবে বসফোরাস।  গ্রিক শব্দ “বস” মানে ষাঁড় আর “পোরাস” মানে হলো ষাঁড়ের চলার পথ।

৬. নাটক শেষ করে বাড়ি আসতেই সক্রেটিস দেখলেন তার খালা ডিওটিমা এসেছেন। ডিওটিমা সক্রেটিসের মায়ের ধর্মের বোন এবং সক্রেটিসের প্রেমবিষয়ক গুরু। প্রেম সম্পর্কে ডিওটিমা সক্রেটিসকে বলেন— ভালোবাসার বাবার নাম ঐশ্বর্য। আর মা হলেন দারিদ্র বা অভাব। ভালোবাসা তার বাবা-মা দুজনেইর বৈশিষ্ট্য পেয়েছে। ভালোবাসার বাবা ঐশ্বর্য মানে সম্পদ, ঐশ্বর্য মানে ক্ষমতা। সেজন্য ভালোবাসার অনেক ক্ষমতা, অনেক শক্তি। তুমি ভালোবাসা দিয়ে বিশ্ব জয় করতে পারবে। পৃথিবীতে ভালবাসার মত শক্তিশালী জিনিস আর নেই। আর ভালোবাসার মা হলেন অভাব। সেজন্য ভালোবাসার চারপাশে সব সময় একটি অভাব। মানুষ প্রেমে পড়লে শুধু চাই আর চাই। তাই ভালোবাসার সাথে সবসময়ই একটি অভাব জড়িয়ে থাকে, সব সময় একটি না পাওয়ার ব্যাপার থাকে। ভালবাসার জন্ম হয়েছে সৌন্দর্যের দেবীর জন্মদিনে। সেজন্য ভালবাসা সবসময় সুন্দর এর খোঁজ করে। যেখানেই সুন্দর কিছু আছে, সেখানেই ভালোবাসা।  ভালোবাসা হলো ঐশ্বর্য আর অভাব এর সন্তান। এই দুটি হলো পুরোপুরি বিপরীত। ঐশ্বর্য সুন্দর আর অভাব অসুন্দর। ভালোবাসার যেমন সুন্দর করার ক্ষমতা আছে,  তেমনি কিছু অসুন্দর করার ক্ষমতাও আছে। ভালোবাসা যেমন মঙ্গল করে, তেমনি হিংসার জন্ম দেয়। তাই ভালোবাসার শান্তি আনে, তেমনি ভালোবাসা থেকে যুদ্ধ হয়। মানুষ প্রথমে দেহের সৌন্দর্য দেখে ভালোবাসে। সবাই এভাবেই শুরু করে। এরপর একটু জ্ঞান বাড়লে আর শরীরের সৌন্দর্য নয়, মনের সৌন্দর্য খুঁজে। সেটি আরেকটু উঁচু পর্যায়ের ভালোবাসা। মানুষ যখন আরো একটু বুঝতে শেখে তখন সে জ্ঞানকে ভালবাসতে শুরু করে। একসময় সে হয়ে যায় জ্ঞানের প্রেমিক। আর জ্ঞানের প্রতি প্রেমই হল সবচেয়ে উচ্চ পর্যায়ের ভালোবাসা।

“প্রেমের পবিত্র শিখা চিরদিন জ্বলে,

স্বর্গ হতে আসে প্রেম, স্বর্গে যায় চলে।”

ছোট প্রেম সংসার গড়ে আর বড় প্রেম সংসার ভাঙ্গে।  বড় প্রেম বিরহের জন্য উপযোগী, সংসারের জন্য নয়।  সংসার হল দুটি মানুষের প্রতিদিনের তুচ্ছ ঝগড়া-ঝাটি,  রাগ-ক্রোধ, অভিমান মিশানো একঘেয়ে অম্ল-মধুর জিনিস। তার জন্য দরকার সাধারন, একঘেয়ে ছোট্ট প্রেম।  বড় প্রেমে এগুলো খাপ খায় না। বড় প্রেম হল হঠাৎ উচ্ছ্বাস, দুজনকে ভাসিয়ে নেয়, আশেপাশের মানুষকে নাড়িয়ে দেয়। এই প্রেম দিয়ে ভালো সাহিত্য হয়, কিন্তু ভালো সংসার হয় না। এই প্রেম দুটি জীবনকে পুড়িয়ে দেয়,  প্রত্যাশার আগুনে ছারখার করে দেয় সংসার।  হেলেন আর প্যারিসের প্রেমে পুড়ে যায় ট্রয় নগর। বড় প্রেম কোন কিছুকে ধরে রাখে না, ধরে রাখে ছোট প্রেম।  তাই অনেক আশা নিয়ে শুরু হওয়া বড় বড় প্রেমের সংসার সুখি হয় না। সুখি হয় ছোট প্রেমের সংসার। ছোট প্রেম নিজে ছোট বলে অন্যায় রাগ-ক্রোধকে জায়গা দিতে পারে, আর জায়গা দিতে দিতে ছোট প্রেমের ব্যক্তিত্ব বড় হয়ে, সে স্যাক্রিফাইস করতে শিখে যায়। আর বড় প্রেম নিজে বড় বলে একটি ছোট্ট অভিমানকেও জায়গা দিতে পারে না, ছাড় না দিতে দিতে বড় প্রেমের ব্যক্তিত্ব ছোট হয়ে যায়, সেক্রিফাইস কি জিনিস সেটা ভুলে যায়। তাই ছোট প্রেমের সংসার গড়ে আর বড় প্রেমের সংসার ভাঙ্গে।

৭. একদিন মন খারাপের সময় সক্রেটিস একটি বাঁশি বের করল। সে বাঁশি বাজাতে জানে না। বাঁশি বাজায় ক্রিতো। ক্রিতো বাঁশিতে সুর তুলল। একাকিনী নিশুতির বিরহের সুর। কেন বিরহের সুর তুলল তা সে জানে না। এটি সক্রেটিস ও ক্রিতোর দুঃখ বিলাস। এদের কোন দুঃখ নেই।  তবুও মানুষ দুঃখজীবী প্রাণী। মানুষের অন্তরে দুঃখ কোঠা আছে। সে কোঠায় সব সময়ই কিছু না কিছু দুঃখ থাকে।  পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের একটি দুঃখ কোঠা আছে।  সেখানে কারণে-অকারণে বাঁশি বাজে। বিরহের বাঁশি। ক্রিতো বাঁশি বাজানো বন্ধ করলে সক্রেটিস বলল– “সুর আত্মাকে শুদ্ধ করে। একটা আবছা অলস উদাসীনতা নিয়ে আসে।” এই কথাটি মূলত বলেছিলেন পিথাগোরাস।  পিথাগোরাস বীণা বাজাতেন। গণিতের হিসেব দিয়ে তিনি বীণা বানাতেন। তিনি বলতেন সংগীত হলো পুরোপুরি গণিতের মত। তিনি প্রথম বের করেছিলেন যন্ত্রের তারগুলো মাপ মত বসাতে পারলে ভিন্ন ভিন্ন সুর তৈরি হয়। হারমনি তৈরি হয়। এই তথ্য দিয়েই তিনি বিনা বানিয়ে ছিলেন। আজ আমরা আধুনিক সঙ্গীতের যেসব বীণা দেখি, যেসব সুর যন্ত্র দেখি সেগুলো মূলত পিথাগোরাসের তত্ত্ব অনুযায়ী বানানো।

৮. আগোরার একটা দামি জিনিসের দোকানে প্রতি মঙ্গলবার সক্রেটিস ঠিক সন্ধ্যার পরে আসতেন। এসেই বিভিন্ন জিনিস দামাদামি করতেন। একদিন সিমন সক্রেটিসকে বলল– এই দোকানে এসে কিছুতো কেন না। তাহলে কেন আসো? সক্রেটিস বলল, এই দোকানে এথেন্সের সব থেকে ভালো ভালো জিনিস আছে। কিন্তু এসবের কিছুই আমার নেই। এগুলো কেনার ক্ষমতাও আমার নেই। এত এত জিনিস ছাড়াও যে আমি ভালো থাকতে পারি সেটি পরীক্ষা করতে আসি। কত দামী দামী জিনিস বাদ দিয়েও যে সুন্দর জীবন পাওয়া যায় সেটি বোঝার জন্য আসি। আমার উদ্দেশ্য– অল্প সম্পদে সুন্দর জীবন। এই দোকানে বসেই এক দোকানির সাথে আলাপকালে সক্রেটিস স্বাধীনতার সংজ্ঞা বের করে আনলেন। “স্বাধীনতা কী?”

সক্রেটিস একবার দোকানিকে বলল- স্বাধীনতা কী?

দোকানি বললো- স্বাধীনতা মানে নিজের অধীনতা। আমি অন্য কারও অধীনে নই। নিজের যা ইচ্ছা হবে, তাই করতে পারা।

সক্রেটিস বলল যা ইচ্ছা তাই করা, তাহলে আমার ইচ্ছা হচ্ছে এখন তোমাকে খুন করবো। সেটা কি আমার স্বাধীনতা?

দোকানি – না, না। কি বলছ? আমাকে খুন করবে। তোমার বিবেক আছে, বিবেচনা আছে।

সক্রেটিস- ভালো বলেছ। বিবেক-বিবেচনা। যা খুশি করার আগে ভাবতে হবে। কিন্তু ধরো, আমার বিবেক বিবেচনা নেই। আমার ইচ্ছা আমি তোমাকে খুন করবো। এটি কি আমার স্বাধীনতা?

দোকানি –  না, না। দেশে আইন কানুন আছে।

সক্রেটিস-  খুব ভালো। ঠিক জায়গায় এসেছে। তাহলে স্বাধীনতা কি দাঁড়ালো?

দোকানি- নিজের বিবেক বিবেচনা দিয়ে বিচার করে,  দেশের আইন মেনে, অন্যের অধীনে না হয়ে নিজের ইচ্ছায় চলার নামই স্বাধীনতা।

সক্রেটিস- খুবই চমৎকার বলেছো। আমিও একমত।

৯. এথেন্সে এক অদ্ভুত শাসন শুরু হয়েছে। এই শহরে কোন রাজা, নেই রানী। কোনো একজন মানুষের কথায় দেশ চলে না। মন্দিরের পুরোহিত বা যাজকদের নির্দেশেও চলে না। কিছু ধনী মানুষও দেশ চালায় না। নগরের সব মানুষ মিলে নিজেরাই নিজেদের শাসন করে। যেকোন বিষয়ে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিস্টেমের নাম তারা দিয়েছে গণতন্ত্র বা মানুষতন্ত্র। এথেন্সের মানুষ ভাবল মারামারি না করে, সবাই মিলে ভোট দিয়েও শাসক বানানো যায়। অস্ত্রের শক্তি বাদ দিয়ে তারা মানুষের শক্তিকে ধরল। নাম দিল ডিমোস (Demos) ক্রাতিয়া (Cratia) মানে মানুষের শাসন। পণ্ডিতেরা পুথির ভাষায় নাম দিল গণতন্ত্র (Democracy). এই গণতন্ত্রের নায়ক হলেন পেরিক্লিস। পেরিক্লিস হলেন দেবতা জিউসের মত শক্তিশালী। তিনি এথেন্সের প্রাণপুরুষ। তার কথায় এথেন্সের সংসদ চলে। তিনি এথেন্সের সংসদের প্রধান নেতা। তিনি এথেন্সকে সাজিয়ে ছিলেন গ্রিসের অন্যান্য শহরের চেয়ে সবচেয়ে বেশি সুন্দর করে। সেটা স্পার্টানদের পছন্দ হয়নি। তাই  স্পার্টানরা এথেন্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ২৫ ধরে চলা সেই যুদ্ধে এথেন্স হেরে যায়। ধুলোয় মিশে যায় পেরিক্লিসের স্বপ্ন ও পেরিক্লিসের আদর্শনগর এথেন্স।

১০. ড্রেকো (Draco) হচ্ছে ইউরোপের প্রথম আইন প্রণেতা। সে আইন লিখল। কিন্তু তার কিছু বাতিক ছিল। সে ভুল সহ্য করতে পারত না। সে ভাবতো মানুষের কোন ভুল থাকতে পারবে না। মানুষ হবে দেবতার মত নির্ভুল। ড্রেকো ছোটখাটো সব দোষের জন্য শাস্তি লিখল “মৃত্যুদণ্ড”। একটি বাঁধাকপি চুরির শাস্তি ফাঁসি। কাজে ফাঁকি দিলে ফাঁসি। ছোট-বড় সব দোষের জন্য ফাঁসি। তার নাম থেকেই “Draconian” শব্দটি এসেছে যার অর্থ “খুবই নির্মম”। ড্রেকোর আইনে সবারই প্রাণ যায় যায় অবস্থা। সবাই ঠিক করল আইন বদলাতে হবে। তাই সবাই খোঁজে বের করল সালোন নামে একজন আইনপ্রণেতা, দার্শনিক ও কবিকে। সরকারি চাকরিতে শুধু উচ্চবংশের লোকজন থাকতো। তারা হলো অভিজাত। তাদের রক্ত নীল। শুধু তারাই শাসন করবে। বাকি সব শাসিত হবে। এই ব্যবস্থা সালােন বাতিল করে দিলেন। সালোনের একটি কবিতা —

“প্রতিদিন বয়স বাড়ে

প্রতিদিন নতুন কিছু দেখি

পুরনো সূর্য উঠে নতুন করে

প্রতিদিন আমি নতুন কিছু শিখি।”

১১. পারস্য আর গ্রিসের যুদ্ধে সাধারণ জনগণ তাদের ইচ্ছায় যুদ্ধের জন্য ভোট দিল। তাদের কোন রাজা নেই, রানি নেই। নিজেকে বাঁচানোর যুদ্ধ। এথেন্সের গণতন্ত্র সেদিন মাতৃভূমিকে বাঁচাতে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলো। ঠিক হলো এজিয়ান সাগর তীরে ম্যারাথন নামক জায়গায় পারস্য বাহিনীর মুখোমুখি হবে এথেন্স। পারস্যের সৈন্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় এথেন্সের সাহায্য দরকার। ওই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী নগর হলো স্পার্টা। স্পার্টাকে খবর দেওয়ার জন্য ফিডিয়াস নামক একজন ব্যক্তি শুরু করলেন দৌড়। পাহাড়ি এলাকায় কোনো রাস্তা নেই। ঘোড়া যেতে পারবে না। দৌড়ে গিয়ে খবর দিতে হবে। ফিডিয়াস শুরু করলেন জীবন বাঁচানোর দৌড়। এথেন্সকে বাঁচানোর দৌড়। মাতৃভূমিকে রক্ষা দৌড়। স্পার্টায় পৌঁছে যুদ্ধের কৌশল জানালেন। তাকে স্পার্টাও জানালো তারা এথেন্সে সহায়তা করবে। সেই খবর নিয়ে এথেন্সের কাছে উপস্থিত হতে থাকলেন। এথেন্সকে বাঁচানোর জন্য ফিডিয়াস ২০০ মাইলেরও বেশি দৌড়েছেন। দৌড়ে এথেন্সের কাছে এসেই দেবী এথেনার মূর্তি ছুঁয়ে চিৎকার করে বললেন আমরা জিতে গেছি আর মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ফিডিয়াস ম্যারাথন প্রান্ত থেকে খবর নিয়ে ৪২ কিলোমিটার দৌড়ে এসে মৃত্যুবরণ করেন। এথেন্সের এই দৌড়বিদ ফিডিয়াস এর স্মরণে সারাবিশ্বে আয়োজন করা হয় ম্যারাথন দৌড় প্রতিযোগিতা। এথেন্সের এইসব গৌরবগাথা কাহিনী লিখেন হেরোডোটাস তার “The Histories” বইতে। ইতিহাস বিষয়ক এটাই প্রথম বই বলে হেরোডোটাসকে বলা হয় ইতিহাসের জনক।

১২. চিকিৎসকরা সবাই দেবতা এসক্লিপিয়াসের বংশধর। দেবতার এক মেয়ের নাম হাইজিয়া (Hygieia) এখান থেকেই হাইজিন শব্দটি এসেছে। অন্য মেয়ের নাম প্যানাসিয়া (Panacea) মানে সর্ব রোগের নিরাময়। হিপোক্রেটিস চিকিৎসার দেবতার ১৫ তম বংশধর। হিপোক্রেটিস শুরু করলেন চিকিৎসার এক নতুন পদ্ধতি তাই তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক।

এথেন্সে প্লেগ রোগ হানা দিলে হিপোক্রেটিস এর ছাত্ররা বিভিন্ন ঘরে ঘরে গিয়ে রোগের চিকিৎসা করানোর সাথে সাথে বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েন। হিপোক্রেটিস তাদের ছাত্রদের নিয়ে সমুদ্রপাড়ে বনভোজনের আয়োজন করেন। বনভোজনে তিনি সবাইকে সুরা পান করেন। সুরা পান করানোর পর সবাই যার যার মতো সত্য ঘটনা স্বীকার করেন। কে কত টাকা নিয়েছেন? কে কোন নারীর গায়ে হাত দিয়েছেন? এই ঘটনার পর হিপোক্রেটিস পাপিরাস কাগজে লিখে ফেললেন “চিকিৎসা বিদ্যার শপথ।” এটাই Hippocratic Oath নামে সারাবিশ্বে পরিচিত। সারাবিশ্বের চিকিৎসকগণ এই শপথ বাক্য পাঠ করেন। বিভিন্ন দেশে মূল থিম ঠিক রেখে শপথের ভাষাটি পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে।

১ম শপথ — চিকিৎসা বিষয়ে আমি কোন রোগের যা কিছু দেখি বা শুনি তা সম্পূর্ণরূপে গোপন রাখবো। কারো ব্যক্তিগত কোনো তথ্য প্রকাশ করব না।

২য় শপথ — আমি শুধু চিকিৎসা সেবার উদ্দেশ্যেই কারো গৃহে প্রবেশ করবো। অন্য কোন উদ্দেশ্য নয় এবং অবশ্যই সব ধরনের ইচ্ছাকৃত ক্ষতিসাধন থেকে বিরত থাকব। বিশেষত কোন নর – নারীকে কখনোই শারীরিকভাবে অপব্যবহার করবো না।

৩য় শপথ — আমি আমার চিকিৎসাবিদ্যা শুধুই অসুস্থ মানুষকে ভাল করার জন্য কাজে লাগাবো কখনোই কোন খারাপ উদ্দেশ্যে কাজে লাগাব না।

১৩. ১৫ বছর ধরে পেরিক্লিস এথেন্সকে সাজিয়েছেন। দেবী এথেনার মন্দির তৈরি করেছেন। আলোক ঝলমলে এথেন্স নগরী তৈরি করেছেন যা দেখে স্পার্টা এথেন্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পেরিক্লিসের শত্রু সংখ্যাও বেড়ে যায় একে একে পেরিক্লিসের বন্ধুদের বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার মামলা দেওয়া হয়। পেরিক্লিসের বন্ধুরা অনেকেই এথেন্স ছেড়ে চলে যায়। না হয় কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়। পেরিক্লিসের বিরুদ্ধেও ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। এথেন্সের গণতন্ত্রের মহানায়ক এর পেরিক্লিসকে সংসদের সবার সামনে ক্ষমা চেয়ে মিথ্যা অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে হয়। এথেন্স স্পার্টার যুদ্ধে পেরিক্লিসের দুই সন্তান নিহত হন। পেরিক্লিসের আর কোন বংশধর না থাকায় আসপাসিয়ার ছেলে পেরিক্লিস দ্বিতীয়কে এথেন্সের নাগরিকত্ব দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন তিনি। কিন্তু মা এথেন্সের নাগরিক না হওয়ায় পেরিক্লিস দ্বিতীয়কে এথেন্সের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না। পরবর্তীতে মাতার নাম না লিখে পেরিক্লিস দ্বিতীয়কে দেওয়া হয় এথেন্সের নাগরিকত্ব।

১৫. কবি মেলিতাস সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অফিশিয়ালি মামলা করেন। তাকে প্ররোচিত করেন এনিতাস নামের একজন রাজনীতিবিদ। পেরিক্লিসের মৃত্যুর পর এনিতাস হয়ে যান গণতন্ত্রের নেতা। এনিতাস নাট্যকার এরিস্টোফেনিসকে দিয়ে নাটক লিখান তার নাম “মেঘ।”মেঘ নাটকে সক্রেটিসকে খুব বাজে ভাবে উপস্থাপন করা হয়। ধর্মদ্রোহিতা’র অভিযোগ এনে সক্রেটিসের বিচারকাজ শুরু হয়। বিচারের রায় মৃত্যুদণ্ড ২৮০ ভোট, খালাস ২২০ ভোট। আপিল করার সুযোগ থাকলেও সক্রেটিস নমনীয় না হয় তার চিরাচরিত ভঙ্গিতে কথা বললে দ্বিতীয়বার ভোটের ফলাফল হয় মৃত্যুদণ্ড ৩৪০ ভোট, খালাস ১৬০ ভোট। কিন্তু কীভাবে সক্রেটিসের মৃত্যু দন্ড হবে সেটা ঠিক করবেন সক্রেটিস নিজে। জেলে বন্দী থাকা অবস্থায়ও সক্রেটিস সবার মধ্যে জ্ঞান বিতরণ করতে ছিলেন। জেলে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি তরুণদের ভিড় লেগেই থাকত। সক্রেটিসের বন্ধু ক্রিতো ঠিক করলেন হেমলক পানে সক্রেটিস মৃত্যুবরণ করবেন। মৃত্যুর দিন সক্রেটিস তার স্ত্রী জেনথিপিকে চলে যেতে বললেন। জেনথিপি তিন ছেলেকে নিয়ে চলে গেলেন। মৃত্যুর আগে জেনথিপি সক্রেটিসকে বলেছিলেন তিনি একটি গন্ধ পাচ্ছেন। অন্য রকম গন্ধ, একটি মরণ গন্ধ।

১৬. এথেন্সের ধর্মভীরু মানুষের মৃত্যুর পর আত্মার মুক্তির জন্য দেবতাকে মুরগি উপহার দেয়। সক্রেটিস ক্রিতোকে বললেন- আমি মরলে দেবতাকে একটি মুরগি দিও। তখন ক্রিতো ভাবলো এর মানে কি? সক্রেটিস কি বুঝাতে চেয়েছেন? তিনি দেবতাদের অপমান করেন নি। তিনি নাস্তিক নন। নাকি সারা জীবন যেমন সবকিছু নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন তেমনি এটিও তার ব্যঙ্গ। মরার আগে কি তিনি এথেন্সের বিচার ও ধর্মের নামে অধর্মকে ব্যঙ্গ করে গেলেন। এর উত্তর ক্রিতো জানেন না। সক্রেটিস ছাড়া কেউ জানে না।

১৭. সক্রেটিসের দেহ পোড়ানো হবে না কবর দেওয়া হবে এ বিষয়ে সক্রেটিস কিছু বলেননি। এটি তিনি ক্রিতোর উপর  দিয়ে গেছেন। কিন্তু ক্রিতো এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত কিভাবে নিবেন? এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষ একজনই। তিনি হলেন জেনথিপি। সক্রেটিসের জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত জেনথিপি নেননি। এই শেষ সিদ্ধান্তটি তিনি নেবেন। সক্রেটিসের মরদেহ চলছে সমাধির পথে। আঁধারের ঘোমটা মাথায় দিয়ে জেনথিপি হাঁটছেন সমাধির দিকে। তিনি কাঁদছেন না। তার পায়ে পায়ে কাদঁছে কতগুলো জলপাই পাতা। সন্ধ্যার আঁধার ছাপিয়ে একটি পাখি নিদারুণ করুন সুরে ডাকছে। পাখির কন্ঠে দুনিয়ার সমস্ত বিরহ ঝরে ঝরে পড়ছে। এজিয়ান সাগর এর উষ্ণ বাতাস ভিজে উঠছে। মহাকালের গহবর থেকে ভেসে আসছে অচেনা একটি মরন-মরন গন্ধ। একটি অবিনশ্বর মৃত্যুর জ্যোতি নিয়ে অদ্ভুত আঁধার নেমেছে পৃথিবীতে। মহাবিশ্বের মহত্বম মৃত্যু ঘটে গেল।

বইটি পড়েছি আর আমিও মনে মনে হেমলক পান করেছি।

 


 

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ একটি মাস্টার পিস বই ।। অনিকেত রাজেশ

বইটি পড়তে গিয়ে নিশ্চিতভাবেই মনে হবে, এই বইটিই আপনি পড়তে চাচ্ছিলেন। আর পড়ার পর নিজে থেকে আগ্রহী হয়েই অন্য অনেককে হয়তো এটি পড়তে বলবেন। এটি তেমনই একটি বই। বইটির নাম ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’। লেখক সুজন দেবনাথ। সাহিত্য, ট্রাজেডি ও কমেডি নাটক, ইতিহাস, গণতন্ত্র, বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা শাস্ত্র এসবের জন্ম কিভাবে হলো সেই গল্প নিয়ে বইটি।

বইয়ের নামটা শুনলেই সক্রেটিসের কথা মনে আসে। সক্রেটিস হেমলক বিষ পানে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। হ্যাঁ, মূল চরিত্র সক্রেটিস। এই উপন্যাসের কোন চরিত্রই কাল্পনিক নয়। সক্রেটিসের সাথে আছেন তার প্রধান শিষ্য দার্শনিক প্লেটো; ইতিহাসের জনক হেরোডটাস; ট্রাজেডি নাটকের তিন পিতা – সফোক্লিস, ইউরিপিডিস এবং এস্কিলাস; কমেডি নাটকের জনক এরিস্টোফানিস; চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক হিপোক্রাটিস এবং সক্রেটিসের স্ত্রী জেনথিপি। এথেন্সের গণতন্ত্রের প্রধান মানুষ পেরিক্লিস এবং সে সময়ের একমাত্র নারী দার্শনিক আসপাশিয়া এই উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র।

যারা ইউরোপীয় সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করেছেন, তাদেরকে এই উপন্যাসে রক্ত-মাংসে জীবন্ত করেছেন লেখক। এটি সুজন দেবনাথের প্রথম উপন্যাস। তিনি তিন বছর এথেন্সে থাকার সময় গ্রিসে ক্লাসিকাল সময়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে দেখেছেন খ্রিস্টের জন্মের আগের পঞ্চম শতকটি। এই শতকেই সক্রেটিস বেঁচে ছিলেন। পৃথিবীর জ্ঞানের জগতের অনেক কিছুর শুরু এসময়। সেই শুরুর কথাই স্যাটায়ার আর উইট মিশিয়ে একটিমাত্র সুখপাঠ্য গল্পে নিয়ে এসেছেন সুজন দেবনাথ। নাম দিয়েছেন ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’।

এই বইয়ের সাথে  বাংলা কোন বইয়ের তুলনা দিতে আমার মনে আসবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ বা ‘প্রথম আলো’। সুনীল যেমন কলকাতা কেন্দ্রিক বাংলার রেনেসাঁর গল্প অত্যন্ত মুন্সীয়ানার সাথে আমাদেরকে দিয়ে ছিলেন, সেরকম এথেন্স শহরে পৃথিবীর সবচেয়ে সৃষ্টিশীল সময়ে কিভাবে এতো কিছুর জন্ম হলো, সেটিকে একেবারে চলচ্চিত্রের ভঙ্গিতে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে এই উপন্যাস।

এথেন্সের সক্রেটিস কমিউনিটি বইটির গল্পের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সক্রেটিসের জন্মদিন উপলক্ষে এথেন্সে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে সক্রেটিস কমিউনিটি লেখক সুজন দেবনাথকে আমন্ত্রণ জানান, যে অনুষ্ঠানে আমি অনলাইনে অংশগ্রহণ করেছিলাম। ঐ অনুষ্ঠানে এই গল্পের ইংরেজী অনুবাদ ‘Taste of Hemlock’ নিয়ে আলোচনা করেন এথেন্সের সক্রেটিস বিশেষজ্ঞগণ। তারা ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’এর গল্পটিকে বিশ্ব সাহিত্যের একটি অনন্য সংযোজন হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

এই গল্পে সক্রেটিস দুষ্টুমি আর রসিকতায় সুন্দর জীবনের কথা বলছেন। সেই রসিকতা থেকেই প্লেটো শিখছেন জীবনের মানে। তাদের কথা থেকে জন্ম নিচ্ছে দর্শন, জন্ম হচ্ছে জ্ঞান। একইসাথে সক্রেটিস তুমুল প্রেমিক মানুষ। তিনি স্ত্রীর সাথে খুনসুটি করছেন, করছেন তুমুল ঝগড়া। চুপিচুপি গল্প করছেন সময়ের সবচেয়ে বুদ্ধিমতী মেয়ে আসপাশিয়ার সাথে। এক বয়সী নারীর কাছে শিখছেন – প্রেম কি জিনিস। আসামী হয়ে দাঁড়িয়েছেন আদালতে। শান্তভাবে চুমুক দিচ্ছেন হেমলক পেয়ালায়। প্লেটো খুঁজে পাচ্ছেন – শরীরের আকর্ষণ ছাড়া সাধু সন্ন্যাসী ধরণের এক প্রেম। যার নাম প্লেটোনিক প্রেম। রাগে দুঃখে কবি প্লেটো তার কবিতা, নাটক সব পুড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি কবি থেকে হয়ে যাচ্ছেন কঠিন এক দার্শনিক। প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্র থেকে কবি-সাহিত্যিকদের নির্বাসন দিচ্ছেন। এভাবে গল্পের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে খুলে যাচ্ছে মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান শুরুর ঘটনা। 

সাহিত্য এবং নাটকের জন্মের কাহিনী লেখক নিয়ে এসেছেন অনেক সাবলীলভাবে। মহাকবি হোমার কিভাবে তার ইলিয়াদ ও অডিসি বই দুটি লিখলেন, আর এ দুটো মহাকাব্যের মধ্য দিয়েই তিনি কিভাবে ইউরোপীয় সাহিত্যের মূলধারাটি তৈরি করে দিলেন, সেটিও গল্পের মধ্য দিয়ে বলা যায়, তা এই বইতে লেখক দেখিয়েছেন। হোমারের সময় ছাড়িয়ে থিয়েটার এবং ট্রাজেডি ও কমেডির নাটক কিভাবে শুরু হলো সে বিষয়টি উঠে এসেছে গল্পে। এই বইতে ট্রাজেডি নাটকের জনক এস্কিলাস মঞ্চে অভিনয় করছেন ‘প্রমিথিউস বাউন্ড’। সফোক্লিস লিখতে বসলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ট্রাজেডি নাটক ‘রাজা ইদিপাস’। তিনি কেন লিখলেন ইদিপাস? তার চোখে কে ইদিপাসের মতো ব্যাভিচারী? সে হলো এথেন্সের গণতন্ত্রের প্রধান মানুষ পেরিক্লিস। পেরিক্লিসকে মানুষের কাছে ইদিপাস হিসেবে তুলে ধরছেন নাট্টকার। পেরিক্লিস বিয়ে করতে পারেননি সময়ের সবচেয়ে বুদ্ধিমতী নারী আসপাশিয়াকে? অথচ তাদের সন্তান আছে। এই ব্যাভিচারের জন্যই তিনই ইদিপাস। তার পাপেই এথেন্স ধ্বংস হবে। নাট্টকার ইউরিপিডিস একটি গুহায় বসে লিখছেন নাটকের ‘ট্রয়ের মেয়েরা’। কমেডি নাটকের জনক এরিস্টোফানিস লিখছেন সক্রেটিসকে নিয়ে প্রহসন নাটক ‘মেঘ’।

পৃথিবীতে ইতিহাস লিখা কিভাবে শুরু হলো, সেটি এই বইতে নিঁখুতভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। ইতিহাসের জনক হেরোডটাস এথেন্সে আসছেন। তিনি লিখতে শুরু করেছেন – পৃথিবীর প্রথম ইতিহাস বই। শুরু হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম রক্তপাতহীন লড়াই – অলিম্পিক গেমস। অলিম্পিক গেমসে গিয়ে হেরোডটাস বলছেন ম্যারাথন যুদ্ধের কথা। তিনি এথেন্সেই প্রকাশ করছেন পৃথিবীর প্রথম ইতিহাস বই।  বিজ্ঞানের জনক থেলিস বের করছেন – পৃথিবীর প্রথম যুক্তি। পিথাগোরাস বের করছেন জ্যামিতির সূত্র, গোল্ডেন রেশিও। সেসব ব্যবহার করে স্থপতি ও ভাস্কর ফিডিয়াস ডিজাইন করছেন দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর ভবন পার্থেনন। নগর পরিকল্পনা শাস্ত্রের জনক হেপোডেমাস বের করলেন প্রথম গ্রিড প্লান নির্ভর নকশা। চিকিৎসাবিদ্যার জনক হিপোক্রাটিস প্রথমবারের মত ঘোষণা দিচ্ছেন – দেবতার অভিশাপ নয়, রোগের কারণ- মানুষের শরীর, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ; তিনি শুরু করছেন পৃথিবীর প্রথম চিকিৎসা বিদ্যালয়, ছাত্রদের নিয়ে লিখছেন হিপোক্রাটিক কর্পাস, বের করছেন ডাক্তারদের জন্য ‘হিপোক্রাটিক শপথ’, চিকিৎসা বিষয়ক আইন।

আমার অনেক দিনের অনেক খটকা থেকে এই বই আমাকে উদ্ধার করেছে। সফোক্লিস কেন ‘ইদিপাস’এর মত কাহিনী লিখলেন, নিজের বাবাকে হত্যা করে মাকে বিয়ে করে ফেলার মতো ভয়াবহ প্লট সফোক্লিসের মতো একজন শক্তিমান লেখক নিয়েছিলেন, সেটি নিয়ে আমার অনেক প্রশ্ন ছিলো। ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’-এ লেখক দেখিয়েছেন কিভাবে সফোক্লিস সেসময়ের গণতন্ত্রণের নেতা পেরিক্লিস ও তার প্রেমিকা আসপাশিয়াকে তার ‘ইদিপাস’ নাটকের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। 

সক্রেটিস ও প্লেটোর দর্শনকে কিভাবে গল্পে নিয়ে আসা যায়, সেটি লেখক সফলভাবে দেখিয়েছেন। আদালতে সক্রেটিসের বিচারের এতো বিস্তারিত বিবরণ এবং সক্রেটিসের শেষ দিনগুলোতে কারাগারে বসে কিভাবে আধুনিক দর্শন জন্ম হলো, সেটিকে যেভাবে কাহিনীতে এনেছেন লেখক, তা যে কোন পাঠককে অভিভূত করার মতো। সক্রেটিস সবকিছুকে প্রশ্ন করতে বলতেন, বিনা প্রশ্নে কোন কিছু মেনে না নেয়ার কথা বলতেন। সেটিকে লেখক মুন্সীয়ানার সাথে ‘প্রশ্নরোগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে কাহিনীতে নিয়ে এসেছেন। সৌন্দর্য, ন্যায়, সদগুণ সক্রেটিস ও প্লেটোর এমন জটিল দার্শনিক বিষয়গুলো গল্পের মধ্য দিয়ে এমনভাবয়ে এসেছে, তা দর্শন নিয়ে পড়াশুনা করা মানুষদের মুগ্ধ করার জন্য যথেষ্ট।

আমরা জানি যে, সক্রেটিসের স্ত্রী জেনথিপি একজন ঝগড়াটে নারী যিনি সারা জীবন সক্রেটিসকে শুধু যন্ত্রণা দিয়েছেন। পৃথিবীর ঝগড়াটে স্ত্রীর প্রতীক হিসেবে জেনথিপির অবস্থান প্রথম দিকে। ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ এই প্রচলিত ধারনায় আঘাত করেছে। এই গল্পের জেনথিপি শুধু ঝগড়াটে নারী নন, একই সাথে মমতাময়ী স্ত্রী। বিশেষ করে সক্রেটিসের মৃত্যুর আগের সময়গুলোতে জেনথিপি আর সক্রেটিসের প্রেমের যে চিত্র লেখক এঁকেছেন, বিশ্ব সাহিত্যে জেনথিপিকে কেউ সেভাবে তুলে ধরেননি। এই বিষয়ে লেখকের যুক্তি হচ্ছে, প্লেটোর লাখ লাখ শব্দের লেখার মধ্যেও মাত্র দুবার জেনথিপির উল্লেখ আছে। যে কারণেই হোক, প্লেটো সক্রেটিসকে চিত্রায়িত করার সময় জেনথিপিকে অবজ্ঞা করেছেন। জেনোফোন ও আরো কয়েকজনের লেখা থেকে জেনথিপির যে চিত্র পাওয়া যায়, সেটা একজন মমতাময়ী নারীর। আর তাই লেখক, প্রেম আর ঝগড়া মিশিয়েই জেনথিপিকে এনেছেন এই উপন্যাসে। সক্রেটিসের শেষ জীবনে স্ত্রীর সাথে রসায়ন বইটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। 

ইতিহাসের জনক হেরোডটাস ভাগ্যের অন্বেষণে এথেন্সে এসে কিভাবে লিখে ফেললেন মানুষের ইতিহাস। মানুষকে বিশ্লেষণ করার মতো ব্যাপার, গ্রিস ও এশিয়ার মানুষদের তুলনা করে তিনি কেন লিখলেন, কেন তিনি হোমারের কাহিনী বদলে ট্রয়ের যুদ্ধের সময়ে হেলেন মিশোরে ছিলেন বলে উল্লেখ করলেন – এসব প্রশ্নের গল্পের মতো উত্তর নিয়ে এই বই।  

অলিম্পিক  গেমসের শুরুর এমন জলন্ত বিবরণ এর আগে বাংলা ভাষায় আমার নজরে আসে নি। ম্যারাথন যুদ্ধ, গ্রিস ও পারস্যের মধ্যে সালামিনা যুদ্ধ এবং সে সময় গণতন্ত্র এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার বিকাশ উঠে এসেছে সাবলীলভাবে। সেসময়ে দেবদেবীর প্রতি ধর্মান্ধ মানুষদের আক্রমণে একের পর সৃষ্টিশীলকে মানুষকে বিচারের নামে হত্যা করার বিষয়টিও অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। লেখক তার রচনায় হোমার, সলোন, পিন্ডারের মতো গ্রিক কবিদের থেকে অনুবাদ তার গল্পে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন যে তাতে কাহিনীতে কোন কমতি তো হয়ই নি বরং তা কাহিনীকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। যেমন অলিম্পিকের কাহিনীতে গ্রিক কবি পিনডারের কবিতা উদ্ধৃত করেছেন, ‘দিন মাস বছর যাবে, ক্লান্ত হবে মহাকাল / তবু পথ গোনা শেষ হবে না / অলিম্পিকের চেয়ে বড় কোন সমাগম/ মহাবিশ্বে আর হবে না হবে না’ এরকম অসংখ্য অনুবাদে কাহিনী সমৃদ্ধ হয়েছে।

এই পুরো বিষয়গুলোকে একটি গল্পে নিয়ে এসে লেখক যে সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, সেটি এক কথায় অনন্য। বাংলা ভাষায় এরকম কাজ আগে হয়নি। গ্রিসের পুরো ক্লাসিক্যাল সময়কে একটি বড় উপন্যাসে ধারণ করা, আগে কখনও হয়নি। বাংলাভাষী সব হেমলকপ্রেমীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য এই বইটি।

শুরুতে আমার খটকা লেগেছিলো উপন্যাসটির ভাষা নিয়ে। সক্রেটিস, প্লেটো, হেরোডোটাসদের মতো কীর্তি পুরুষদের কথা ভাবলেই আমরা রাশভারী কথা শূনতে চাই। মনে হয় তাঁরা সারাদিন বসে শুধু দর্শনের বাণীই দিতেন। কিন্তু সুজন দেবনাথ এই উপন্যাসে একেবারে একুশ শতকের মুখের ভাষা দিয়ে নির্মাণ করেছেন। কিছুদূর আগানোর পর মনে হয়েছে, এই ভাষাটিই বর্তমান সময়ে সক্রেটিসকে তুলে আনার জন্য যথার্থ মনে হয়েছে। এ বিষয়ে লেখক বইয়ের ভূমিকাতে ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তার মতে, সক্রেটিস মানুষ হিসেবে খুবই রসিক ছিলেন, তার কথায় হিউমার আর উইট দুটোই সমান্তালে মেশানো ছিলো এসবের সংমিশ্রণে বর্তমান সময়ের পাঠকদের জন্য সক্রেটিসকে নির্মাণ করতে সমকালীন তরুণদের মুখের ভাষাই বেশি যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে।

আমার মনে হয় গত কয়েক দশক ধরে এমন একটি বইয়ের জন্য আমি অপেক্ষা করছিলাম। বাংলাভাষী পাঠকগণ অপেক্ষা করছিলেন। বইটি সময়ের বিচারে টিকে গিয়েছে এই বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

অনিকেত রাজেশ, কবি ও প্রাবন্ধিক

 


 

লেখকের সাথে আলাপন

 


আরেকটা মাস্টারপিস বই সবাইকে রেকমেন্ড করি ।। মাশরুফ হোসেন

আরেকটা মাস্টারপিস বই সবাইকে রেকমেন্ড করি, সুজন দেবনাথের “হেমলকের নিমন্ত্রণ”। ইউভাল নোয়া হারারি যেমন স্যাপিয়েন্সে মানব জাতির ইতিহাস বলেছেন গল্পের ছলে, সুজন দেবনাথ তেমন বলেছেন মানব জাতির জ্ঞানের ইতিহাসের গল্প।সম্রেটিস, প্লেটো, পেরিক্লিস, হেরাডেটাস, কে নেই এখানে! মানুষের জ্ঞানের বেশ কয়েকটা শাখার উৎপত্তি এমন ভাবে বর্ণনা করেছেন লেখক যে মনে হবে আপনার চোখের সামনেই সব ঘটছে।

গ্রীসে যে একসাথে জ্ঞানের এতগুলো শাখার উৎপত্তি ও উন্মেষ ঘটেছিল, কিভাবে হয়েছিল? এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন লেখক।এ উপন্যাসের মূল চরিত্র সক্রেটিস, তবে সমান তালে আছেন পেরিক্লিস, কাছাকাছি ভাবে রয়েছেন সমসাময়িক অন্যান্য জিনিয়াসগন।আপনি শুধু সক্রেটিসকে জানবেনই না, জানবেন তার চিন্তাপদ্ধতি, তার দর্শন, এবং সেটাও হবে আনন্দের সাথে, হাসতে হাসতে।

অন্বেষা প্রকাশনীর বই, গায়ের দাম আটশ টাকা। যদি দাম বেশি মনে হয়, অন্য বই কয়দিন পরে কিনে হলেও টাকা জমিয়ে এটা কিনুন, ঠকবেন না!

 


মানব সভ্যতা এবং সৃজনশীলতার এক অনন্যসাধারন সময়কে তুলে ধরা হয়েছে
এক বিশাল ক্যানভাসে : জসীম উদ্দিন গওহর

দূতাবাস থেকে আমরা প্রায়ই এথেন্সের পশ্চিমে মালোনাদা গ্রামে যাই। সেখানে অনেক বাংলাদেশী যুবক কাজ করে। ঐ গ্রামের ক্ষেত খামারে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে এইসব যুবক নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে। ক্ষেতের কাজের মৌসুম আছে। ঐরকম সময়ে কাজ ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়া সম্ভব হয়না এঁদের পক্ষে। সেইজন্য আমরাই তাঁদের কাছে যাই। এইসব কাজে একেক সময় একেকজন সহকর্মী আমার সহযাত্রী হন। এক ভোরে আমার সহযাত্রী হলো সুজন দেবনাথ। সুজন দূতাবাসে কাউন্সেলর। সুদক্ষ এবং আন্তরিক কর্মকর্তা। সেইজন্য তার সুনাম আছে।

সেই ভোরে আমরা গল্প করতে করতে যাচ্ছি। এর মধ্যে সুজন তার লেখা গল্পের পাণ্ডুলিপি বের করলো। বললাম, তুমি পড়ো আমি শুনি। প্রথম বাক্যেই আমি চমকে গেলাম এবং এরপরের কয়েক পৃষ্ঠা শুনে মোহাবিষ্ট হয়ে গেলাম। পড়া শেষ হবার পর আমি খুবই সৎ কিন্তু অমেধাবী একটি মন্তব্য করলাম। বললাম, তোমার লেখা শুনে মনে হল সক্রেতিসের আশপাশে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা বসানো ছিলো। আর সব ঘটনা যেন তুমি নিজে দেখেছ।

সেই পুরোনো একটা সময়কে এইরকম প্রাণবন্ত, প্রাণময় করে তুলতে গেলে কল্পনা শক্তি থাকতে হয়, থাকতে হয় কলমের শক্তি। সুজনের সেই শক্তি আছে। তার ফল, ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’। পাঁচশ পৃষ্ঠার এই উপন্যাস। মানব সভ্যতা এবং সৃজনশীলতার এক অনন্যসাধারন সময়কে তুলে ধরা হয়েছে এক বিশাল ক্যানভাসে। প্রতিটি পৃষ্ঠায় আছে পরিশ্রমের ছাপ। প্রচুর পড়াশুনার ছাপ। গ্রীসের সৃজনশীলতার ঐ সময় নিয়ে এর আগে এতো বিশাল ব্যপ্তিতে বাংলা ভাষায় কোনো উপন্যাস লেখা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এবারের বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে হেমলকের নিমন্ত্রণ।

// জসীম উদ্দিন গওহর, কবি এবং রাষ্ট্রদূত, বাংলাদেশ দূতাবাস, এথেন্স ।

 


 

 

আমাদেরকে হেমলক পান করিয়ে অমৃতের সন্ধান দিয়ে গেছেন অনায়াসে
অথৈ আদিত্য

বন্ধু ও ব্যাচমেইট Sujan Debnath বা অব্যয় অনিন্দ্য। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী~ কাজ করেন গ্রীসের এথেন্সে, বাংলাদেশ দূতাবাসে। এই পরিচয়টা না দিলেও হতো, দিলাম যে তার কারণ হচ্ছে, আমলার আমলনামার গন্ডি ডিঙ্গিয়ে তিনি একটি ‘কাজ’ করেছেন (কাজের আগে ‘দু:সাহসিক’ শব্দটি যোগ করা উচিত!)। কাজটি হচ্ছে তিনি সক্রেটিসকে নিয়ে একটি ‘ঢাউস’ উপন্যাস লিখেছেন, কলমের যাদুকরী শক্তিতে আমাদেরকে নিয়ে গেছেন খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ এবং পঞ্চম শতাব্দীতে। গ্রীসের স্বর্ণকালের সূর্যসন্তানেরা উঠে এসেছেন গল্পের পাতায়~ সত্যিকার রক্তমাংসের মানুষ হয়ে। গ্রীস নিয়ে বাঙালি লেখক যেখানে লিখেন রসকষহীন দার্শনিক তত্ত্ব, সুজন’দা হেঁটেছেন অন্যপথে, পথটি কথাসাহিত্যের। ইতিহাসের সাথে লেখকের কল্পনার যে মিশেল এই চ্যালেঞ্জটা বাঙালি অনেক লেখকই নিয়েছেন বটে, তবে প্রথম উপন্যাসেই সেই কাজটি করে দেখিয়েছেন হাতে গোনা গুটি কয়েক লেখকমাত্র। সুজন দেবনাথ সেই হাতেগোনা গুটিকতক লেখকদের একজন এখন। ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ তাই শুধু সুজনদার দু:সাহস নয়, এর নাম ‘চ্যালেঞ্জ নেওয়া এবং ছুঁড়ে দেওয়া’।

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ মাত্র পড়া শুরু করেছি। গল্পের পাতায় পাতায় যে বিস্ময় আর গল্পকারের মুন্সিয়ানা দেখি, এতে নিজের ভিতরে অপরিসীম আনন্দ হচ্ছে, একধরণের গর্ববোধ হচ্ছে। পাঠককে গল্পের ভিতরে ঢুকিয়ে তাকে বের হতে না দেওয়া, তাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখা~ এই কাজটি সুজনদা করে দেখিয়েছেন জাত কথাশিল্পীর মতো। তিনি শুধু  ‘হেমলক’ পান করার নিমন্ত্রণই জানান নি, আমাদেরকে হেমলক পান করিয়ে অমৃতের সন্ধান দিয়ে গেছেন অনায়াসে।

স্বজনপ্রীতিমুক্ত হয়েই ঘোষণা দিতে চাই, ‘অবশ্যপাঠ্য বই’-এর তালিকায় নিশ্চিতভাবেই এই গ্রন্থকে রাখা যেতে পারে অনায়াসে।

বইমেলায় প্রকাশিত হাজারো গ্রন্থের উৎসব মেলায় আমাদের জন্য ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ তাই একটি অসাধারণ উপহার।

অভিনন্দন, সুজনদা!

// অথৈ আদিত্য, কথা সাহিত্যিক এবং উপসচিব

 


 

পিডিএফ মেলায় ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ রিভিউ  পড়তে এখানে ক্লিক করুন

pdfmela

 


পরীক্ষা সামনে রেখে রূদ্ধশ্বাসে পড়েছি পাঁচশতাধিক পৃষ্ঠার এই বই ।। দেবাশীষ কর

কি হচ্ছে? কেন হচ্ছে? কিভাবে হচ্ছে? এই ‘?’ চিহ্নটির ছড়াছড়ি আজও বিশ্বজুড়ে। জীবনকে আরেকটু সুন্দর, অনেকটা সুন্দর, অসম্ভব সুন্দর আর সর্বোচ্চ সুন্দর করতে মানুষের দুর্নিবার প্রচেষ্টা আর প্রচেষ্টা করার জন্য ইচ্ছের আঁতুড়ঘর হিসেবে গ্রিসের কাছে গোটা পৃথিবী ঋণী। ঋণ স্বীকার করতেই হবে এসবের দাইমা সক্রেটিসের কাছে। প্লেটোর অনন্য, অসাধারণ সক্রেটিস কিংবা স্পার্টার জেনোফোনের অতিসাধারণ এক সাদামাটা সক্রেটিস। যেরূপেই সক্রেটিসকে দেখতে চাওয়া হোক না কেন, সব বিতর্ক আর দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে শাশ্বত সত্য এই যে, সক্রেটিস অমর। সক্রেটিস, ক্রিতো, অ্যানাক্সাগোরাস, সফোক্লিস, ইউরিপিডিস, পেরিক্লিস, আশপাশিয়া, আরও কতশত, হাহাকার জাগানিয়া কত নাম। এনিতাস কিংবা কালের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া ধিক্কার জাগানিয়া কত নাম। বিবেচনাহীনভাবে করুণ ইতিহাসের প্লট সৃষ্টি করে দেয়া এরিস্টোফানিস। এসব ছাড়িয়ে শাশ্বত সত্য এই যে, ৭১ এর শহিদেরা আজ যেমন আমাদের গর্ব, অতীতের গ্রিসে হাহাকার জাগানিয়া নামগুলোও আজ তার গর্ব। তাদের বলিদানে উর্বরা হয়েছে গ্রিস। শহিদজননীর মতই ধন্য এজিয়ান সাগর পাড়ের গ্রিস। বিশ্বের জ্ঞান পথ দেখেছে গ্রিসে, এইসব অমর নামগুলোর যুগে। সেই ঋণ শোধের জন্য তাদের প্রতি সসম্মান সম্মান প্রদর্শনই একমাত্র পথ। ক্ষুদ্র জ্ঞানে এটাই বিশ্বাস করি যে, জ্ঞানের ঋণ শোধের একমাত্র পথ, সেই জ্ঞানের চর্চা করা। সেই জ্ঞানকে ধারণ করা। সক্রেটিসের প্রতি আজকের সভ্যতার অংশ হিসেবে বাঙালির যে ঋণ, সেটা শোধের পথে আমাদের একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন লেখক সুজন দেবনাথ। হেমলক অমর হয়েছে সক্রেটিস নামটির সাথে জুড়ে গিয়ে। মহাকালের পথে পথচলায় লেখকের জন্যেও শুভকামনা। আরও কিছু বলার চাইতে শেষ এভাবেই টানতে পারি যে, বইটির ফ্ল্যাপ কভারের, ভূমিকার লেখাগুলোই পথ দেখাবে। গোটা বইটা পড়লেই যেকেউ বুঝতে পারবেন, বাঙালির ঋণের বোঝা যে কি পরিমাণ কমেছে।

পুণশ্চঃ পরীক্ষা সামনে রেখে রূদ্ধশ্বাসে পড়েছি পাঁচশতাধিক পৃষ্ঠার এই বই। এখন করোনা যুগেও সাথী করেছি।

// দেবাশীষ কর

 


 

ক্লাসিকাল গ্রিসকে জানতে তাহলে এই বইয়ের কোন বিকল্প নাই ।। সমেন মজুমদার

“হেমলকের নিমন্ত্রণ ” এ প্রকৃতপক্ষে লেখক   allegorically  সক্রেটিস, পেরিক্লিস, আশপাশিয়া,আনাক্সাগোরাস  প্রভৃতি চরিত্রের মাধ্যমে  আমাদেরকে rational হওয়ার তথা ‘সুন্দর মানুষ ‘ হওয়ার  আহবান জানিয়েছেন। এবং এই সুন্দর মানুষ অর্থাৎ   rational হওয়ার জন্য আমাদের পান করতে হবে অনেক হেমলকরূপ গরল।তাই আমি মনে করি এই উপন্যাসের নামকরণ যথার্থ।

এত সহজ সরল ভাষায়,রসিকতার ঢঙে গ্রিক মিথলজি ও গ্রিসের অগ্রযাত্রার সময়কাল লেখক বিধৃত করেছেন ; যা লেখকের মুন্সিয়ানারই বহিঃপ্রকাশ।

সাহিত্যের ছাত্র ছাত্রীদের কাছে খটমটে ক্লাসিকাল সাহিত্য (গ্রিক ট্রাজেডি, কমেডি,মহাকাব্য ) এই বইতে লেখক ‘পান্তাভাত ‘ করে উপস্থাপন করেছেন।

ভাষার ক্ষেত্রে ‘মানদণ্ডের’ চেয়ে ‘যোগাযোগ ‘ কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই তিনি দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন প্রায়োগিক শব্দকে নির্দ্বিধায় ব্যবহার করেছেন। (তুমি তো একটা জিনিস )।

  লেখক দৈনন্দিন কথপোকথনে একধরনের ‘রসিকতা’ ও ‘হেয়ালি’ ব্যবহার করেছেন যা পাঠকে মোহাবিষ্ট করে রাখে।যে রসবোধ ও উপস্থাপনা শুধু জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ এর লেখনীতে পাওয়া যায়

পেরিক্লিস,আশপাশিয়ার সামাজিক বিপর্যয় ও সক্রেটিসের মৃত্যুর ঘটনা  fairy tale  না হয়ে আর একটু rationally উপস্থাপিত হলে ভালো হত বলে মনে হয়।

লেখকের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় থাকায় এবং বইয়ের প্রকাশনা বিষয়ে অবগত হওয়ায় আমি জানি, খুবই অল্প সময়ের মধ্যে বইটি বইমেলায় এসেছে  তাই কিছু বানান বিভ্রাট হয়েছে।

কেউ যদি রঙ্গ রসিকতায়, মজা মাস্তিতে জ্ঞান আহোরণ করতে চায়, জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা, গণতন্ত্র  প্রতিটা শাখার উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে চায়,  ক্লাসিকাল সাহিত্য (গ্রিক নাটক, মহাকাব্য ) তথা গ্রিসের সোনালি অধ্যায় জানতে চায় তাহলে এই বইয়ের কোন বিকল্প নাই।

// সমেন মজুমদার

*********

 


 

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ পাঠের অনুভূতি  ।। মোহাম্মাদ এনামুল কবির খান (সুদান)

হেমলকের নিমন্ত্রণঃ  বইটা পড়া হয়েছে ৩ সপ্তাহ হয়ে গেছে,লেখক কে অভিনন্দন জানিয়ে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিব দিব করতেই এত দিন চলে গেলো। চমৎকার একটি বই “হেমলকের নিমন্ত্রন “, আসলে চমৎকার বললে কিছুই বলা হয় না এই বই সম্পর্কে। অসাধারণ।আন্তরিক অভিনন্দন Sujan Debnath

লেখক একজন সাস্টিয়ান অনুজ সে ভরশাতেই নিজের অনুভুতি নিসংকচে লেখার সাহস করলাম যা নিতান্তই একজন পাঠকের অনুভূতি, বুক রিভিউর মত ওজনদার কিছু না।

বহুদিন পর ঢাউস সাইযের একটা বই পড়লাম প্রায় সাড়ে পাঁচশো পাতা। প্রথমে উপন্যাস মনে করলেও  বইটিকে কাহিনীগল্প বলাই ভালো যা মূলত বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস এর জীবনের গল্প,লেখক নিজেও মূখবন্ধে বলেছে “যা কিছু লিখি গল্পের মতো লিখি”।

সক্রেটিস এর গল্পে দার্শনিক তত্ত্ব কথা থাকবে তাই একটু খটখটে হতে পারে ধরে নিয়েই পড়া শুরু করেছিলাম কিন্তু না আশংকা ভুল প্রমান করে এক টানে শেষ করেছি। চমৎকার ঝর ঝরে গদ্যে পড়তে কষ্ট হয়নি এক্টুও।সক্রেটিস এর গল্প বলতে গিয়ে চলে এসেছে আরো সব বিখ্যাত লোকেদের গল্প। দার্শনিক প্লেটো, ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস,নাট্যকার ইউরিপিদিস,চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক হিপোক্রাটিস এবং আরো অনেক। এত সব বিখ্যাত মানুষের সবাইকে একই গল্পে অসাধারণ ভাবে নিয়ে এসেছে সুজন। কিভাবে করলো এই অসাধ্য সাধন।আসুন সুজনের কাছেই শুনি….” আমার অনুসন্ধান ছিল মোটামুটি তিন ভাবে। সেই সময়টাকে পড়ে ফেলা,তারপর নিজের চোখে ঘটনার জায়গাগুলা দেখা,এরপর জটিলতা থাকলে কোন গ্রিক বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলা।এই অনুসন্ধান থেকেই ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ ‘। ” বলাই বাহুল্য বইটি দাড় করতে লেখক কে ব্যাপক পড়াশুনা করতে হয়েছে ।

বইটি পড়তে গিয়ে অনেক মজার জিনিষ জেনেছি যেমন যৌবনে প্রেমে পরে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রই ব্যার্থ হয়ে প্লেটোনিক বলে চালিয়ে দিয়েছি কিন্তু এই প্লেটনিক শব্দটা যে মহামতি প্লেটো র নামানুসারে হয়েছে তা জানতাম না, তারপর আমার অনেক দিনের জিজ্ঞাসা ছিল চিকিৎসা বিদ্যা বা এ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এ আমরা প্রায়ই একটা লাঠির মাথায় প্যাঁচানো সাপের ছবি দেখি এর মানে কি? আবার গনতন্ত্রের সূতিকাগার এ জন্মেছিলেন সক্রেটিস কিন্তু কেনো গণতন্ত্র পছন্দ করতেন না এমনি অনেক প্রশ্নের উত্তর আছে  ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ ‘। বইটিতে প্রচুর অপিরিচিত শব্দ বা বিষয় থাকার পরেও চমৎকার ফুটনোট এর জন্য পড়াটা অনেক সহজ এবং আনন্দময় ছিল।পরের সংস্করণে কিছু ছবি এড করা যায় কিনা ভেবে দেখতে বলবো(যেমন দেবী এথিনার মন্দির,পার্থেনান ইত্যাদি)।নিজে পড়ার সময় আমি ছবি গুলো গুগল করে দেখেছি, তাই আইডিয়াটা শেয়ার করলাম, সাথে সেই সময়কার একটা রাজনৈতিক ম্যাপ।

বইয়ের গদ্যের ব্যাপারে লেখকের ভাষ্য এরকম..

“ভাষার ব্যাপারে আমি এই বইয়ে অত্যন্ত সচেতনভাবে একুশ শতকের তরুনদের মুখের ভাষাটিকে প্রমিতভাবে আনতে চেষ্টা করেছি। “

পড়তে গিয়ে কোথাও কোথাও হুমায়ুন আহমেদের ম্যানারিজম স্টাইল টা মনে পরে গেছে আর যথেষ্ট তরুন না বিধায় দু একটি শব্দ ভালো লাগে নি। সব কিছু ভালো লিখলে অনুভূতি টা একপেশে হয়ে যায় তাই আর কোন খুঁত না পেয়ে এগুলিকেই হাজির করলাম?।লেখকের আর কোন বই পড়া হয় নি,তাই যথেষ্ট নিশ্চিত না তবে দৃঢ় আশাবাদী সুজনের নিজস্ব একটা লেখার ভাষা গড়ে উঠবে।

আমি ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ ‘ বইটির সর্বাঙ্গীণ সফলতা কামনা করি বিশেষ করে টিনেজ ছেলেমেয়েদের জন্য অবশ্য পাঠ্য। আমি নিশ্চিত কোন কোন তরুন পাঠক বইটি পড়ে সক্রেটিস এর মত প্রশ্ন প্রশ্ন খেলাটা আত্মস্থ করে ফেলবে এবং যত বেশি সংখ্যক তরুন প্রশ্ন করা শিখবে ততই মংগল।

মোহাম্মাদ এনামুল কবির খান (সুদান), সিডনী

*******

 


 

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ পাঠের অনুভূতি  ।। শেখ শাহীন আক্তার

অপ্রিয় হলেও সত্যি।নারী অনিয়মের প্রতিবাদ করলে, নারী অনেক পুরুষের চেয়েও বেশি জ্ঞানী হলে , কম বেশি সকলের মাঝে এক প্রকার প্রতিহিংসার জন্ম দেয়। নারী গুনবতী, রুপবতী, প্রতিনিধি, অনেক কিছুর অধিকারী হলে তাকে নিয়ে মিথ্যে গুজব ছড়িয়ে দমাতে হবে এটাই প্রাচীন ইতিহাস বলে ।

আশপাশিয়ার মতো এই যুগের নারীরা সভ্যতার ক্রমধারায় যুগে যুগে সমাজে সকল প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে সততা, সাহসিকতা ও বুদ্ধীমত্বা দিয়ে যেই নারীরা এগিয়ে চলেন তাঁরাই সেরা , তাদের আটকানোর সাধ্য কারোর নেই।

“হেমলকের নিমন্ত্রণ” লেখক সুজন দেবনাথ (স্যার) এই গল্পে “সক্রেটিস” , “আশপাশিয়া” কে নিয়ে বলা কিছু অংশ নিম্নে দেওয়া হলো।এই বইতে অনেক গুলো চরিত্র আছে। তার মধ্যে আসপাশিয়া একটি চরিত্র, কথা গুলো ভালো লাগলো তাই সেয়ার করেছি। ধীরে ধীরে আরো অনেক গুলো চরিত্রের অংশ সেয়ার করবো।

?সংক্ষিপ্ত পরিচিতি———ক্রিতো সক্রেটিস এর বন্ধু। আসপাশিয়া ( Aspasia ) : এথেন্সের সবচেয়ে বিখ্যাত নারী দার্শনিক ।?

ক্রিতো: ফিসফিস করে বলল , ঘটনাতো মানুষ জেনে গেছে । সক্রেটিস: বলল , কোন ঘটনা ? ‘ তার ঘটনা । ‘ তার ঘটনা মানে কার ঘটনা ? ক্রিতো আরও ফিসফিস করে বলল , আসপাশিয়ার ঘটনা । মানুষ জেনে গেছে , তুমি আসপাশিয়ার কাছে যাও । সক্রেটিস বলল , হু , আমি যাই । সবার সামনেই তো যাই । গোপনেতো যাই না !

ক্রিতো এবার সক্রেটিসের একেবারে কানের কাছে মুখ এনে গভীর রহস্য নিয়ে বলল , মানুষ কিন্তু নানান কথা শুরু করেছে । আজেবাজে কথা, কুকথা, সুড়সুড়ি লাগা কথা। সক্রেটিস বলল , তুমি ফিসফাস বন্ধ করো। মানুষ বাজে কথা বললেই আমি বাজে লোক হয়ে যাব না , আসপাশিয়াও বাজে মেয়ে হয়ে যাবে না । সে ভীষণ বুদ্ধিমতী , অসাধারণ জ্ঞানী , অনেক উঁচু স্তরের একজন মানুষ । ‘ তাহলে তার নামে এত বাজে কথা কেন ? ‘ সক্রেটিস বলল , ‘ বাজে কথার অনেকগুলো কারণ!

?এক নম্বর কারণ হলো আসপাশিয়া এথেন্সের নিয়ম – কানুন মানে না । সে নিয়ম – ভাঙা মেয়ে । এথেন্সের নিয়ম হলো মেয়েদের থাকতে হবে অন্তঃপুরে ; মেয়েরা এমনভাবে চলবে যেন সূর্যের আলোও শরীর স্পর্শ করতে না পারে । কিন্তু আসপাশিয়া ঘরে থাকে না , যেখানে খুশি যায় , যার তার সাথে মেশে । এথেন্সের লোকেরা এমন নিয়ম ভাঙা মেয়ে সহ্য করতে পারে না । তারা তাকে বলে খারাপ মেয়ে ।

?দ্বিতীয় কারণ হলো এই মেয়ে অনেক জ্ঞানী । সে অনেক কিছু জানে । পুরুষরা কোনদিন চায় না যে একটি মেয়ে তার চেয়ে বেশি জানুক । পুরুষের কাছে মেয়েরা হলো দুর্বল , অবলা । সেখানে এই মেয়ে অনেক বেশি সুবলা । সে চমৎকার কথা বলে । বক্তৃতা করতেও জানে । গান জানে । কিথারা যন্ত্রও বাজাতে পারে । যেকোন বিষয়ে সুন্দর করে দু’চার কথা লিখে ফেলতেও পারে । এত গুণ থাকলে সেই মেয়েকে এমনিতেই পুরুষরা ভয় পায় । ভয় পেয়ে পথ আটকাতে চায় । আটকাতে না পারলে , তাকে নিয়ে নোংরামি শুরু করে । চরিত্রে কলঙ্ক দেয় । এবার শোন

?তৃতীয় কারণ হলো আসপাশিয়া অসম্ভব রূপবতী । তার মতো সুন্দরী মেয়ে সারা গ্রিসে কোথাও নেই । কিন্তু তার রূপ ঠাণ্ডা আলোর মতো নয় , একেবারে আগুনের মতো জ্বলজ্বলে । এমন মেয়ে যেখানেই থাকুক , তাকে নিয়ে গুজব হবেই । তাকে নিয়ে আলাপ করতে মানুষের ভালো লাগে । তাকে জানুক আর নাই জানুক , সবাই তার কথা বলে বাহাদুরি নিতে চায় । এভাবে তৈরি হয় গুজব । মেয়েদের নিয়ে গুজব মানেই আজেবাজে কথা । মশল্লামাখা কথা ।

ক্রিতো বলল , শেষের কারণটাই আমার পছন্দ হয়েছে । সেই মেয়ে অত্যধিক সুন্দরী , তাই তাকে নিয়ে কানাঘুষা হয় । লোকে বলে , আসপাশিয়া হলো এই যুগের হেলেন । চারশো বছর আগে স্পার্টায় ছিল হেলেন , আর এখন এথেন্সে এসেছে আসপাশিয়া ।

// শেখ শাহীন আক্তার, এথেন্স, নারীনেত্রী ও উদ্যোক্তা

********

 


 

Review of ‘Taste of Hemlock’ in the Philosophy International Journal (PhIJ) of USA ।। Sayed Ahmed

ফিলোসফি ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল-এ রিভিউটি পড়তে এখানে ক্লিক করুনঃ

হেমলকের নিমন্ত্রণ -এর রিভিউ

 


 

জাস্ট মাখো একটা বই “হেমলকের নিমন্ত্রণ”, জাস্ট গোগ্রাসে গিলছি ।। সুমন চ্যাটার্জী

“জেনথিপি” মানে হলুদ ঘোড়া! জ্বী সক্রেটিসের মুখরা(!) বউয়ের নাম।

বৈরাগী মনের সক্রেটিসকে লাইনে আনতে তার মা তার জন্য বউ করে আনে তের বছর বয়সের জেনথিপি কে, যদিও তখন সক্রেটিস সাঁইত্রিশ পার হতে চললো।

জেনথিপি অসম্ভব ভালো বাসেন তার জ্ঞানী বর সক্রেটিসকে কিন্তু জ্ঞানী বর সক্রেটিস ব্যস্ত জ্ঞান বিতরনে এথেন্সের যুবকদের কাছে!

অগত্যা বরকে লাইনে আনতে প্রয়োগ ব্রহ্মাস্ত্র “ঝাড়ি”! সকাল বিকাল ঝাড়ি! এতে না জেনথিপি হতে পারলো আদর্শ স্ত্রী , উল্টো সক্রেটিস হলেন আরো সংসার বিমুখ!

অথচ কত খারাপ আর মুখরা হিসেবে জানতাম জেনথিফিকে!

আহা দাদা Sujan Debnath  জাস্ট মাখো একটা বই “হেমলকের নিমন্ত্রণ”। জাস্ট গোগ্রাসে গিলছি।

জ্ঞান,সভ্যতা,ইতিহাস কিংবা প্রেম কি নেই? দাদা, প্লিজ লেখাটা চালিয়ে যাবেন।সাধারণ পাঠক হিসেবে বলতে পারি আপনার হাত দিয়ে আরো অন্নেক মাষ্টার পিস লেখা আসবে।

// সুমন চ্যাটার্জী

******

 


 

বইয়ের প্রধান চরিত্র অবশ্যই এথেন্স ।। মাশরুর-উর-রহমান আবীর

আড়াই হাজার বছর আগের কথা। এজিয়ান সাগরের পাড়ে ছিলো এথেন্স নামে সুন্দর এক শহর।

সক্রেটিস নামে এক লোক থাকেন সেই শহরে। উনি সারাদিন সবাইকে শুধু প্রশ্ন করেন, আর বলেন ‘নিজেকে জানো’। একসময় বুঝতে পারেন যে, তিনি জানেন যে তিনি কিছু জানেন না; কিন্তু যারা নিজেদের জ্ঞানী বলেন তারা এটাও জানেন না যে তারা কিছু জানেন না।

সক্রেটিসের সাথে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়ান প্রিয় বন্ধু ক্রিতো আর চেরোফেন।

সারা দুনিয়ার নিয়ম, একজন ঘোড়া ছুটিয়ে এসে বলে সে-ই এ রাজ্যের রাজা। এরপর সবাই তাকে মেনে চলে। কিন্তু এথেন্সের মানুষ নতুন এক ধারা তৈরি করলো। দশটা গোত্র থেকে লটারি করে পঞ্চাশজন করে মানুষ নিয়ে মোট পাঁচশো জন মানুষ ঠিক করা হয়। এরাই ভোট দিয়ে নগরের সব নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিদিন লটারি করে নতুন পাঁচশো জন মানুষ নির্বাচিত হয়। এথেন্সে কোনো রাজা নেই, কিংবা এখানে সবাই রাজা। এই নতুন রীতির নাম দেয়া হয়েছে ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্র।

এথেন্সের গণতন্ত্রের প্রধান নেতা পেরিক্লিস। আর তার সহচরী নারী দার্শনিক আসপাশিয়া। এই বলিষ্ঠ পুরুষ আর বিদুষী নারীর অমর প্রেম কখনো বিয়েতে রূপ নিতে পারে না শহরের আইনের জন্য, কিন্তু পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা থাকে অটুট।

এই ধারার গণতন্ত্র আবার সক্রেটিসের পছন্দ না। তাঁর মতে সব কাজের মতো দেশ চালানোর জন্যও বিশেষজ্ঞ দরকার।

সেরা নাট্যকার সফোক্লিস নাটক লিখছেন। একটু লেখেন আর নিজেই চিৎকার করে অভিনয় করে দেখেন ঠিক আছে কিনা। রাজা ইদিপাস, এন্টিগনি, কতো কতো নাটক!

হেরোডটাস নামে এক তরুণ শুরু করলেন নতুন এক ধারা। গ্রিস, মিশর, পারস্য, ব্যাবিলন, এসব জায়গা ঘুরে এসে অনুসন্ধান করে কোথায় কবে কী হয়েছে তা গল্পের মতো বলতে শুরু করলেন আর লিখতে শুরু করলেন। তিনি এর নাম দিলেন হিস্ট্রি বা ইতিহাস।

পেরিক্লিসের পরিকল্পনায় এথেন্সের প্রধান ভাস্কর ফিডিয়াস এক্রোপোলিস পাহাড়ের উপরে নতুন রকম নকশায় তৈরি করেন সুরম্য পার্থেনন। নতুন করেই তৈরি হয় শহরের কেন্দ্রস্থল আগোরা আর পিরাউস বন্দর। পাল্টে যায় পুরো এথেন্স।

মানুষ না মেরেও বীরত্ব দেখানোর জন্য অলিম্পিয়া নামের জায়গায় হয় অলিম্পিক নামের খেলা। বিজয়ীকে পরিয়ে দেয়া হয় জলপাই শাখার মুকুট।

হিপোক্রাটিস নামের এক চিকিৎসক ঘোষণা করেন যে রোগব্যাধি দেবতাদের রোষের কারণে হয় না, বরং এর জন্য দায়ী রোগীর শরীর, চারদিকের আলো-বাতাস আর খাবার দাবার। ছাত্রদের সঠিক পথে রাখতে একসময় হিপোক্রাটিস ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের জন্য লিখে ফেলেন চিকিৎসা বিদ্যার শপথ।

এথেন্সের সাথে স্পার্টার যুদ্ধ শুরু হয়। পেলোপোনেসিয়ান যুদ্ধ। চলতে থাকে বছরের পর বছর ধরে। এর মধ্যেই শুরু হয় ভয়ঙ্কর প্লেগ। এথেন্সের চারিদিকে ভয়াবহ মৃত্যুর মিছিল।

সক্রেটিস সারা এথেন্সের সব যুবকদের নিয়ে ঘুরে বেড়ান আর শিক্ষা দেন। শেষ বয়সে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য হয়ে ওঠেন এক বিদ্বান তরুণ, যার নাম প্লেটো। সক্রেটিস সারাজীবন শুধু বলেছেন, কিছুই লিখে রাখেননি। সুন্দর জীবন গড়ার জন্য তাঁর সেসব কথাই প্যাপিরাসে লিখে রাখতে শুরু করেন প্লেটো।

মামলা হয় সক্রেটিসের নামে। অভিযোগ, তিনি এথেন্সের যুবকদের কুপথে নিয়ে যাচ্ছেন, আর তিনি দেবতাদের মানেন না। গণতান্ত্রিক বিচারে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়।

সক্রেটিসের স্ত্রী জেনথিপি। মুখরা এই রমণী স্বামীর ঔদাসিন্যে বিরক্ত হয়ে নিয়মিত গলা ফাটালেও মৃত্যুদণ্ডের আগের রাতে কারাগারে থাকেন স্বামীর সাথে, সারারাত নির্ঘুম থেকে গল্প করেন।

কারাগার থেকে পালানোর সুযোগ পেয়েও সক্রেটিস পালালেন না। সত্তর বছরের বৃদ্ধ সক্রেটিস হাতে তুলে নিলেন হেমলক গাছের বিষ ভরা পেয়ালা, ঠোঁটে ছুঁয়ে এক চুমুকে শেষ করে ফেললেন।

এসব নিয়েই চমৎকার এক বই “হেমলকের নিমন্ত্রণ”। লিখেছেন কবি-লেখক আবার একইসাথে আমাদের ২৮তম বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের কূটনীতিক Sujan Debnath। প্রায় সাড়ে পাঁচশো পৃষ্ঠার বিশাল এই উপন্যাসে কোনো কল্পিত চরিত্র নেই, সবাই ইতিহাস থেকে নেয়া। তবে সক্রেটিস, পেরিক্লিস, আসপাশিয়া, ক্রিতো, চেরোফেন, প্লেটো, সফোক্লিস, এস্কিলাস, ইউরিপিডিস, এরিস্টোফানিস, সবাই এখানে রক্তমাংসের মানুষ। সবাই কথা বলেন, হাসেন, কাঁদেন, ভালোবাসেন; মনে হয় সবাই আমাদের আশেপাশেই আছেন। তবে বইয়ের প্রধান চরিত্র অবশ্যই এথেন্স। অনেকটা এক প্রজন্মেই জ্ঞানে-গুণে বলীয়ান হয়ে অনুকরণীয় এক সমৃদ্ধ নগর হয়ে ওঠা এথেন্স।

শুধুমাত্র চাকরিসূত্রে এথেন্সে থাকার কারণেই এই সুপাঠ্য উপন্যাসের জন্ম হতে পারে না, এর পিছনে নিশ্চয়ই আছে অনেক আগে থেকেই গ্রিক সভ্যতার প্রতি লেখকের শর্তহীন অনুরাগ।

ইতিহাসের খটমটে চেহারা ছাড়াই গল্পচ্ছলে আড়াই হাজার বছর আগের এথেন্সকে চোখের সামনে আর মনের ভিতরে নিয়ে আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ সুজন ভাইয়ের প্রতি।

প্লেটো, এরিস্টটল, আলেকজান্ডার, আর সমসাময়িক মনীষীদের নিয়ে পরবর্তী লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

// মাশরুর-উর-রহমান আবীর, কথাসাহিত্যিক ও চিকিৎসক।

*******

 


 

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’-পাঠ প্রতিক্রিয়া ।। অমিতাভ বড়ুয়া

মানব ইতিহাসের খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ সাল হতে খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০ সালের গ্রিসের বিখ্যাত সব চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে জানা অজানা অনেক বাস্তব কাহিনী, শব্দের উৎপত্তি, বিভিন্ন নামকরণ  ও তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থাকে লেখক কূটনৈতিক  সুজন দেবোনাথ তাঁর হেমলকের নিমন্ত্রণ’ নামক উপন্যাসে একেবারে  সহজ সাবলীল ভাষায় খুবই দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র সক্রেটিস হলেও বাদ রাখা হয়নি তৎকালীন গ্রিসে জ্ঞান বিজ্ঞানে অবদান রাখা কাউকেই।

অনেকগুলো ছোট বড় নদী যেমন সাগরের মোহনায় গিয়ে মিলিত হয় তেমনি লেখক প্রতিটি চরিত্রকে ছোট ছোট গল্পের গাথুনিতে গেঁথে নিয়ে গেছেন জ্ঞান পুরুষ সক্রেটিসের মোহনায়। ৫২৭ পৃষ্ঠার এত বড়ো উপন্যাসটি পড়তে মোটেই বিরক্ত লাগেনি কারণ লেখক কোনো গুরুগম্ভীর ভাষা ব্যবহার করেননি। একেবারে বহুল প্রচলিত চলিত ভাষাই ব্যবহার করেছেন।এছাড়া গল্পের পরতে পরতে ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো ঢুকে পড়া ও জানার মধ্যে একটা দারুণ উত্তেজনা ছিল।

লেখক গল্পে গল্পে তুলে এনেছেন বিখ্যাত সব চরিত্র,’ দার্শনিক সক্রেটিস,  প্লেটো, ইতিহাসের জনক হেরোডটাস, ট্রাজেডি নাটকের তিন পুরুষ  সফোক্লিস, ইউরিপিডিস ও এস্কিলাস, কমেডি নাটকের জনক এরিস্টোফানিস, চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক হিপোক্রাটিস, এথেন্সের গনগন্ত্রের পূজারী পেরিক্লিস, নারী দার্শনিক আসপাশিয়া, স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের প্রধান পুরুষ ফিডিয়াস, উপপাদ্যের জনক পিথাগোরাস, বিজ্ঞানের জনক থেলিস এবং নগর পরিকল্পনা শাস্ত্রের জনক হিপোডেমাসসহ অারো অনেকেই।

এছাড়া উপন্যাসে সক্রেটিসের স্ত্রী জেনথিপি, বন্ধু দার্শনিক ক্রিতো, চেরোফোন এবং সিমনের মতো চরিত্রের উপস্থিতি বিনোদনের পাশাপাশি অাপনার চোখে পানি এনে দিবেই । বিশেষ করে সক্রেটিসের শেষ পরিণতির এমন অাবেগঘন উপস্থাপন পড়ে কেউ  চোখে পানি ধরে রাখতে পারবে বলে অামার  মনে হয় না অামিও পারিনি। 

বাস্তব ঘটনাবলী নিয়ে এত বৃহৎ উপন্যাস এর অাগে পড়েছি বলে মনে হয় না। এত বড়ো উপন্যাস রচনা লেখক কী পরিমাণ শ্রম ও মেধা কাটিয়েন তা বইটি পঠনে পাঠকবৃন্দ খুব সহজেই অনুমান করতে পারবেন।

বিশেষ করে বিসিএস থেকে শুরু করে যে কোনো শিক্ষার্থী উপন্যাসটি পাঠে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাবেন বলেই অামার মনে হয়েছে যার জন্যে অামি এই উপন্যাস নিয়ে সামান্য কয়েকটা কথা লিখলাম।

অাগ্রহীরা পড়তে পারেন।

অার প্রিয় দাদা লেখক কবি কূটনীতিক সুজন দেবনাথকে এমন একটি উপন্যাস রচনার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ছোট করবো না। শুধু জানাই অনেক অনেক শ্রদ্ধা ও এক রাশ ভালোবাসা।

// অমিতাভ বড়ুয়া

************

 


‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’-পাঠ প্রতিক্রিয়া ।। সত্যজিৎ মজুমদার

এবারের বইমেলা থেকে নেয়া বই হেমলকের নিমন্ত্রণ। লেখা সুজন দেবনাথ। হেমলক নাম শুনলেই মনে পড়ে যায় সেই বিখ্যাত ব্যাক্তির কথা যিনি তার কথা প্রচারে প্রাণ হারিয়েছেন, যুদ্ধ করেছেন ন্যায় এবং সত্যের জন্যে। সত্যি বলতে সক্রেটিসের কথা শুনলেই মনে হয় একজন অতীব বুড়ো লোকজনদের জ্বালাতন করে বেড়াচ্ছেন। সুজনদাদার লেখায় সক্রেটিস হয়ে উঠেছেন পাশের বাড়ির ছোকরা, মধ্যবয়সী কাকু আর শেষ পর্যায়ে দাদু, কিন্তু যার কথায় রয়েছে খোঁচা, নিজেকে জানার, জানাবার। যার বয়স আটকে গেছে খেলতে থাকা বাচ্চার নতুন কিছু শেখার আগ্রহে, জানার আগ্রহে। বই শুরু হয়েছে সক্রেটিস সমস্যা দিয়ে। সক্রেটিসের সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন ক্রিতো। সে সবসময় সক্রেটিসকে ঘিরে থাকে এ নিয়ে তার বাবার চিন্তা অনেক। সক্রেটিস ইঁচড়েপাকা, ছেলেপেলেদের নষ্ট করে। তা নিয়ে ক্রিতোর বাবার খুব টেনশন। বিশাল বড় পরিসরে লেখা এই বইটি নিয়ে তেমন কিছু বলার নাই। তবে বইটি নিঃসন্দেহে সুপাঠ্য। লেখক বইটি বর্তমান প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে লিখেছেন যাতে কেউ বইটি পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে না পড়ে। গ্রীকদের মুখে বাংলা সংলাপ বেশ হাস্যকর হলেও বইতে কিন্তু একটুও মনে হয় নাই আমি অন্যরকম কিছু পড়ছি। আমার কাছে মনে হয়েছে এটাই স্বাভাবিক! শুরুর দিকেই একটা এরকম ডায়লগ আছে এমন-

 ‘ক্রিতো এখন যে হাসিটা দিচ্ছে এর নাম পিতলা হাসি’।

এরকম লেখা দেখলেই ভিতরে ঢোকার আগ্রহ জন্মায়। সক্রেটিসের সময়কার গ্রিস বিশেষত এথেন্স জ্ঞান-বিজ্ঞানে অন্যান্যদের থেকে বেশ এগিয়ে ছিলো। এসময় আবিষ্কৃত হয়েছিলো রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে গণতন্ত্র যা দিয়ে বর্তমান বিশ্বে প্রায় সব রাষ্ট্রই রাষ্ট্র পরিচালনা করে। সক্রেটিসের সঙ্গী ছিলেন ক্রিতো, ইউরিপিডিস (নাট্যকার), সিমন (দার্শনিক ও পাদুকাশিল্পী), এলসিবাইডিস, প্লেটোসহ আরো অনেকে।এরা সক্রেটিসের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। প্লেটো অবশ্য সক্রেটিসের জীবনের শেষদিকে এসে তার সান্নিধ্য পায়। আমরা সবাই জানি সক্রেটিসের বউ সক্রেটিসের সাথে সারাক্ষণ ঝগড়া করত, কারণ সে শুধু চিন্তা করত। তবে সক্রেটিসের বউ সক্রেটিসকে ভালোওবাসত তার প্রমাণ এই বইতে কিছুটা পাওয়া যায়। আমার ব্যক্তিগতভাবে এই বইয়ের প্রিয় চরিত্র দুটো। পেরিক্লিস এবং আশপাশিয়া। এ দুজনের প্রেম এতো সুন্দর করে লেখক তার লেখনীতে নিয়ে এসেছেন যা বলাই বাহুল্য। আসপাশিয়া নারী তা সে যত বড় দার্শনিক হোক না কেন, নারীর ঘরে পুরুষ না থাকলে সে অরক্ষণীয়া তা অই আমলে যেমন এ আমলেও তেমনই। লেখার ফাকে ফাকে গ্রিক পুরান, হোমারের কবিতা এবং তার সাথে কাহিনীর সামঞ্জস্য মিলে দারুন এক কাহিনী তৈরি হয়েছে। সক্রেটিসের জীবন এরকম একটা তুচ্ছ ঘটনায় যাবে সেটা ভাবতেও খারাপ লাগে। কিন্তু এরকমই হয়েছে আর এরকমই হয়। বর্তমান সময়ে আমরা করোনায় গৃহবন্দি, আর সেইসময় এথেন্স ছিলো প্লেগে বন্দি। প্লেগ শেষ হবার পর এথেন্সের জীবনযাত্রা বদলে গিয়েছিলো। মেয়েরা যারা বাইরে আসতো না তারাও বাইরে আসতে শুরু করেছিলো। পেরিক্লিসের মৃত্যুতে গণতন্ত্রে বেশ একটা আঘাত এসেছিলো। হয়তো করোনাও আমাদের জীবনযাত্রা বদলে দেবে! ম্যারাথন, এথেন্স, ইলিয়াদ, অডিসি, ইদিপাস প্রভৃতি নানা গল্প উঠে এসেছে এখানে। আর হেমলক পানে হেমলকও হয়েছে অমর। সুন্দর জীবনের জন্যে, সেটাকে পাওয়ার জন্য মাথা নত করেন নি তিনি। বইটিতে বেশ কিছু সুন্দর উক্তি রয়েছে যেমন-

‘একটি সন্তান জন্মের কষ্ট সহ্য করার চেয়ে আমি তিনবার যুদ্ধে যেতে রাজি’- ইউরিপিডিস

‘আমি পৃথিবীতে এসেছি শুধুই ভালোবাসার জন্য, কখনই ঘৃণা করার জন্য নয়’-সফোক্লিস

শেষ করছি সক্রেটিসের প্রেমের গুরু ডিওটিমা খালার প্রেমের ব্যখ্যা দিয়ে-

“ভালোবাসার বাবা হলেন ঐশ্বর্য্য। ঐশ্বর্য্য মানে সম্পদ, ঐশ্বর্য্য মানে ক্ষমতা। সেজন্য ভালোবাসার অনেক ক্ষমতা, ভালোবাসার অনেক শক্তি। তুমি ভালোবাসা দিয়ে বিশ্ব জয় করতে পারবে। পৃথিবীতে ভালোবাসার মত শক্তিশালী জিনিস আর নেই। আর ভালোবাসার মা হলেন অভাব। সেজন্য ভালোবাসার চারপাশে একটা অভাব। মানুষ প্রেমে পড়লে শুধু চাই আর চাই। আরও বেশি চাই। মনে হয় আমি পেলাম না, সবাই পেল, শুধু আমিই পেলাম না। যখন সে একটু পায়, তখন আরও চায়। যখন আরও বেশি পায়, তখন শুরু হয় হারাই হারাই ভয়। মনে হয় এই বুঝি হারিয়ে যাবে, এই বুঝি চলে যাবে। এ হারানোর ভয় যতোদিন থাকে ততোদিনই ভালোবাসা থাকে। যে মুহূর্তে হারানোর ভয় শেষ, সে মুহূর্তে ভালোবাসা ও শেষ। তাই ভালোবাসার সাথে সবসময়ই একটা অভাব জড়িয়ে থাকে, সবসময় একটা না পাওয়ার ব্যাপার থাকে।“

বাসায় থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদে থাকুন। বই পড়ুন, পরিবারকে সময় দিন।

// সত্যজিৎ মজুমদার

*********

 


goodreads.com -এ ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ রিভিউ

goodreads এ হেমলকের নিমন্ত্রণ – এর রিভিউ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

হেমলকের নিমন্ত্রণ -এর রিভিউ

 


 

হোম কোয়ারেনটাইনে পঠিত – ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ ।। মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আরিফ

আমরা অনেকেই জানি জ্ঞান বিজ্ঞানের অনেকগুলো শাখার উৎপত্তি গ্রিসের ক্লাসিকেল সময়ে অর্থাৎ খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ সাল হতে খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০ সালের মধ্যে কিন্তু তার ব্যপ্তি যে আসলে কতটা ব্যপক তার সম্যক ধারণা বইটি পড়ার আগে আমার মোটেই ছিল না।

লেখকের ভাষায় “ ঐ সময়ে একঝাঁক মনীষী মেতে উঠেছিলেন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। আমি সেই উল্লাসটাকে একটি গল্পে ধরতে চেয়েছি। সৃষ্টিশীল মানুষগুলোর জীবন আর সৃষ্টিকে একটি কাহিনীতে আনতে চেয়েছি। আমি আশ্রয় করেছি সক্রেটিশের উপর। সক্রেটিশই কেন্দ্রীয় চরিত্র।

এ উপন্যাসের কোন চরিত্রই কাল্পনিক নয়। অন্যান্য চরিত্রগুলো হচ্ছেঃ দর্শনিক প্লেটো; ইতিহাসের জনক হেরোডটাস; ট্রাজেডি নাটকের তিন পিতাঃ সফোক্লিস, ইউরিপিডিস ও এস্কিলাস; কমেডি নাটকের জনক এরিস্টোফানিস; কিচিৎসা শাস্ত্রের জনক হিপোক্রাটিস; এথেন্সের গনগন্ত্র এবং জ্ঞানচর্চার প্রধান পৃষ্ঠপোষক পেরিক্লিস; নারী দার্শনিক আসপাশিয়া; স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যের প্রধান মানুষ ফিডিয়াস; সক্রেটিশের স্ত্রী জেনথিপি এবং তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু দার্শনিক ক্রিতো; চেরোফোন এবং সিমন।এছাড়া গল্পেন ছায়ায় আছেন দার্শনিক পিথাগোরাস, বিজ্ঞানের জনক থেলিস এবং নগর পরিকল্পনা শাস্ত্রের জনক হিপোডেমাস।”

তৎকালীন সময়ে গ্রীসের ধনী শ্রেনীর মানুষেরা কোন কাজ করতো না তাদের যাবতীয় কাজ কর্ম করতো তাদের দাসেরা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ধনীরা তাদের অখন্ড অবসর ভোগ বিলাসে ব্যয় না করে জ্ঞান বিজ্ঞানের পেছনে ব্যয় করেছেন যা সাধারনত প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় দেখা যায় না।

একট খুব ইন্টারেস্টিং বিষয় সক্রেটিসের দারুন জনপ্রিয় উক্তি “ নিজেকে জানো”  কিন্তু এই বই পড়েই জানলাম উক্তিটি আদতে সক্রেটিসের নয় , সক্রেটিসের সময়ে আগে থেকেই এথেন্সে অবস্থিত এপোলো মন্দিরে ঢোকার মুহূর্তে লেখা ছিল ”নিজেকে জানো ” ।

আর বইটিতে সক্রেটিশের স্ত্রী জেনথিপিকেও দেখানো হয়েছে অনেক কমনীয় ভাবে। ইতিহাসের সবখানেই জেনথিপিকে উপস্থাপন করা হয়েছে ভীষন ঝগড়াটে মহিলা হিসাবে এবং সেটা এমন মাত্রায় যে ডিকশনারীতে জেনথিপি শব্দটি স্থান পেয়েছে ঝগড়াটে কুচুটে মহিলার প্রতিশব্দ হিসাবে ।

তৎকালীন সময়ে মহিলাদের অবস্থান সমাজে কেমন ছিল তাও চমৎকার ভাবে লেখক এখানে তুলে ধরেছেন।

সক্রেটিশ নিজে আজীবন একটি শব্দও লিখেন নি। অথচ তার দার্শনিক উক্তি সমূহ শত শত বছর ধরে পৃথিবীতে বহাল তবিয়তে জ্ঞান বিতরন করে চলেছে।

সুজন দেবনাথ মাঝে মাঝে ফেসবুকে লিখেন। আমার স্ত্রীর ফেসবুক ফ্রেন্ড হওয়াতে এবং একটু অন্যরকম লেখার প্রতি আমার আগ্রহ থাকায় মাঝে মাঝে ফেসবুকে তার লেখা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। অসাধারণ তার সে সব লেখা কিন্তু এই বইয়ে তার সে স্ট্যান্ডার্ড অনুপস্থিত। হয়তো একটি অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ কালের অসাধারণ সব মেধাবী মানুষদের জ্ঞান চর্চায় বিষয়টিকে ইতিহাসের নিরিখে বই এর মলাটে লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে লেখক লেখার সে স্ট্যান্ডার্ড ধরে রাখতে পারেন নি। পড়ার সময় মাঝে মাঝেই বইটি কিশোরদের জন্য লেখা বলে মনে হয়েছে তবে গ্রীসের ক্লাসিক্যাল সময়কে এত ব্যাপকভাবে সব চরিত্রগুলোকে একসাথে এক মলাটে লিপিবদ্ধ করার এত পরিশ্রম সাধ্য কাজ আর কোন বই এ দেখেছি বলে আমি অন্তত মনে করতে পারছি না।

পেশায় কূটনীতিক সুজন দেবনাথের বর্তমান কর্মস্থল এথেন্স । গ্রীসে অবস্থানের সুবাদে তিনি খুঁজে বেরিয়েছেন খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ সাল হতে খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০ সালের সেইসব স্থান , গবেষনা করেছেন সেই সময়কাল নিয়ে আর তারই ফলশ্রুতি প্রায় ৫০০ এরও অধিক পৃষ্টার উপন্যাস হেমলকের নিমন্ত্রণ।

আগ্রহী পাঠকদের বইটি পড়ে দেখার আমন্ত্রন রইলো।

// মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আরিফ

 


 

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’-পাঠ প্রতিক্রিয়া ।। বাঁধন সরকার

“ট্রাজেডি”, যারা জ্ঞান ও সুন্দরের জন্য মানুষের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করেন আর মানুষ তাদের নির্মমভাবে হত্যা করেন, পুড়িয়ে মারেন । ?

প্রায় 2500 বছর পূর্বে এথেন্সে জন্ম নেওয়া মহান মহান দার্শনিক’র সঙ্গে কিছু সময়ের জন্য ভেসে বেড়ানো।

পৃথিবীর মানচিত্র, ইতিহাস, ভূগোল, চিকিত্সাবিদ্যা, গনতন্ত্র, রাজনীতি, কূটনীতি, প্রেম, যুদ্ধ, ব্যাবসা, শিল্পকলা, ভাস্কর্য, থিয়েটার, অলিম্পিক, ম্যারাথন, পার্থেনন, য্যোতিরবিদ্যা, দেব দেবীর বিশ্বাস, সক্রেটিস’র মানুষ নিয়ে মহান ভাবনা মানুষের সুন্দর জীবনের স্বপ্ন, সবকিছুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা ট্রাজেডির বর্ননা, কিশোর/ কিশোরী দের জন্য এক অনন্য রচনা বলা যায়। যারা সন্তানদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করতে চান, তাদের কে জ্ঞানের প্রতি কৌতূহলী করতে চান, সে সকল মা বাবা সন্তান কে এই “হেমলকের নিমন্ত্রণ” তুলে দিন ।

লেখক সুজন দেবনাথ’র প্রতি শুভকামনা ও ভালোবাসা, এমন সহজ সরল ভাষায়, অসাধারণ বিষয় ও বক্তব্য তুলে ধরার জন্য।

(বিদ্রঃ সুযোগ থাকলে প্রচ্ছদ জলপাই রং করে দিতাম ।পরবর্তী সংস্করণে আসপাশিয়ার বিদ্যা অর্জনের বিষয়ে কিছু যুক্ত করা হবে আশা করছি । কারন “কেরামিকাস” থেকে উঠে আসা এক নারী এত বিদ্যুষী হলেন কি করে ? কৌতূহল রয়ে গেছে ।

// বাঁধন সরকার


 

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’-পাঠ প্রতিক্রিয়া ।। মোহাম্মদ সানাউল্লাহ

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ পেয়ে পান করলাম হেমলক, সক্রেটিস মারা গেল আর আমি জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশ করলাম মনে হলো। ধন্যবাদ সুজন, বন্ধু। এমনিতেই আমার পাঠাভ্যাস সীমিত।  রবি, নজরুল, মুজতবা,…, শওকত ওসমান কিছু কিছু পড়েছি। তার পর জাফর ইকবাল, হুমায়ুন আহমেদ পড়েছি। প্রতিবছর বই মেলায় যাই, কিছু বই কিনি নতুন লেখকদের। পড়ি কিন্তু মনে রাখা যায়, মনে ধরে এমন কিছু পাচ্ছিলাম না। এবারে বইমেলায় যখন গেলাম তখনও ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ প্রকাশিত হয়নি। পরে রকমারি থেকে হেমলকের নিমন্ত্রণ সংগ্রহ করে পড়লাম। বইটি আয়তনে বেশ বড়, ৫২৫ পৃষ্ঠা। প্রথমে ভাবলাম বইটি পড়ব নাকি আমার বিষয়ের লেখাপড়া করব। ভাবান্তে পড়া শুরু করলাম ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’।  যতই পড়ি, ততই না পাওয়া জ্ঞানের স্বাদ পেত থাকি। ক্রিতো, সফোক্লিস,… যে নামগুলো মনে রাখা এতোদিন দুর্বোধ্য মনে হত এখন মনে হয় তারা আমার বন্ধু। কখনো মনে হয় আমিই সক্রেটিস আবার কখনো মনে হয় আমি পেরিক্লিস। মনে হয় ঘটনাদি আমার চারপাশেই ঘটছে এবং আমি এথেন্সে আছি যদিও তা খ্রিস্টপূর্ব  ৪০০ থেকে ৫০০ বছর আগের ঘটনা। নাটকের শুরু থেকে ইতিহাস, চিকিৎসা, অর্থনীতি সব কিছুর যেন এইমাত্র শুরু হল। আশ্চর্যের বিষয় হলো লেখক ইতিহাসকে কি স্মার্টলি উপন্যাস বানিয়ে ফেলল যেখানে সার্থক উপন্যাসের সব দিক বর্তমান। প্লেটো, এরিস্টটল আরেকবার জীবিত হতে চায়— বন্ধু সুজন।

// মোহাম্মদ সানাউল্লাহ, শিক্ষক, হরগঙ্গা কলেজ, মুন্সীগঞ্জ

 


 

লেখকের হেমলকের নিমন্ত্রণ কোনো পাঠকই চাইলেও উপেক্ষা করতে পারবেন না 
নিলয় প্রামাণিক  

হেমলকের কথার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস।বইটি ২৫০০বছর পূর্বের সক্রেটিস সময়কার এথেন্সের কাহিনী। বইটির কোনো চরিত্রই কাল্পনিক নয়,কিন্ত লেখক চরিত্রগুলোর কথোপকথন বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য এত চমৎকার সংলাপের মধ্য দিয়ে মূল কথাগুলোকেই বলে ফেলেছেন যা সত্যি অবিশ্বাস্য এবং উপভোগ্য যা পাঠক হৃদয়কে পরের পাতা পড়বার জন্য সদা ব্যকুল করে রেখেছে। বইটিতে উঠে এসেছে এথেন্স তথা পৃথিবীর প্রথম দর্শন,সাহিত্য,সংস্কৃতি,ইতিহাস, গণতন্ত্র, প্রেম,চিকিৎসাবিদ্যা ইত্যাদি।

সেসময়কার সাহিত্য বলতে ট্র্যাজেডি নাটক ছিল খুব জনপ্রিয়।সফোক্লিস এর ‘রাজা ইদিপাস’ নাটকটির কাহিনী সকলের লোকমুখে ছিল।এছাড়াও ইউরিপিডিস ও এস্কিলাসের নাটকগুলোও মানুষ পছন্দ করতো।কমেডি নাটক হিসেবে এরিস্টোফানিসের ক্লাউডস বা মেঘ যেখানে সক্রেটিসকে বিদ্রুপ করা হয়েছিলো, সেটিও তৎকালীন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো।এছাড়াও এ বইটিতে হোমারের ‘ইলিয়াদ’,’ওডিসির’ কাহিনীও মাঝে মাঝে বলা হয়েছে।

এথেন্সকে বলা হয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার।বইটিতে পেরিক্লিসের হাত দিয়ে উঠে এসেছে পৃথিবীর প্রথম গণতন্ত্র। গণতন্ত্র ও এথেন্স ছিলো পেরিক্লিস নেতার প্রথম ভালোবাসা।বন্ধু ফিডিয়াসের সহায়তায় পুরো এথেন্সে স্থাপত্য নির্মান করে পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য তৈরি করে ফেলেছিলেন। তিনি এক উজ্জ্বল প্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন সুন্দরী আসপাশিয়াকে অভদ্র পল্লী থেকে নিজ বাড়িতে বধূর মতো স্থান দিয়ে।পেরিক্লিস সুন্দরের পূজারী ছিলেন।দার্শনিক আসপাশিয়া পেরিক্লিসের ঘর সামলানোর পাশাপাশি তার প্রধান পরামর্শক ও বক্তৃতা লিখে দিতেন।মহামারী প্লেগে গণতান্ত্রিক নেতা পেরিক্লিসের মৃত্যুর পর অবশ্য আসপাশিয়াকে করুন পরিনতি মেনে নিতে হয়েছিলো।বইটিতে উঠে এসেছে ইতিহাসের জনক হেরোডোটাসের অলিম্পিকে ম্যারাথনের কাহিনী বর্ননা এবং পেরিক্লিসের সাহায্যে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের ভ্রমন বিষয়ক তার বিখ্যাত বই ‘ইতিহাস’ নয়টি খন্ডে রচনা।

এছাড়াও আছে চিকিৎসা বিদ্যার জনক হিপোক্রাটিস এর বিখ্যাত থিওরি।তিনিই প্রথম বলেন যে অসুস্থতার সাথে দেবদেবীদের কোনো সম্পর্ক নেই বরং মানুষের আশেপাশের পরিবেশ যেমন জল,মাটি,হাওয়া,খাদ্যাভাস ইত্যাদি দায়ী।চিকিৎসকদের যে শপথ বাক্য পাঠ তার উৎপত্তিও হয়েছিল গ্রীসে।

সবশেষে আসা যাক কেন্দ্রীয় চরিত্র বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস যিনি প্রশ্ন প্রশ্ন খেলা ও কথার মারপ্যাঁচে নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেন ও বিতরন করেন এবং যার উদ্দেশ্য হচ্ছে সত্য ও সুন্দর জীবন।তার ত্যারা ত্যারা প্রশ্নের জন্য কিছু মানুষ তাকে ইচরেপাকা ও অপছন্দ করতো।তার সঙ্গী ক্রিতো,ইউরিপিডিস,চেরোফোন,সিমন(পাদুকাশিল্পী)সহ তৎকালীন এথেন্সের তরুন সমাজ তার জ্ঞান ও সত্যের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিলো।তার প্রধান শিষ্য ছিলো প্লেটো,সক্রেটিসের মতে প্লেটোই তাকে বেশি বুঝতো।সক্রেটিসের বিভিন্ন জিনিসের ব্যাখ্যা অনেকে তন্ময় হয়ে শুনতো।তিনি ছিলেন কথার জাদুকর।সক্রেটিসের খালা ডিওটিমা ‘ভালোবাসা’ কথাটার যে ব্যাখ্যা লেখক বাংলা ভাষায় এখানে যেভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন তা এক কথায় অনবদ্য।

সক্রেটিস ছিলেন অনেকটা রহস্যময় চরিত্রের।চেহারা ও পোষাকেও তার ছাপ ছিলো।বিবাহিত হলেও ছিলেন সংসার বিবাগী।এজন্য স্ত্রী জেনথিপি সবসময় তার সাথে রাগারাগি করতো।তবুও স্ত্রী ও পুত্রের কথা মনে করে একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেছিলেন তা থেকে বোঝা যায় তিনি প্রেমিক ও পুত্রবৎসলও ছিলেন।

পুরো এথেন্স জুড়েই ছিলো তার জ্ঞানের স্কুল।সিমনের দোকান,জিমনেসয়াম,অ্যাগোরা,সিম্পোজিয়াম সবখানেই জ্ঞান বিতরন করেছেন।বলে চলেছেন হাজারো বানী-‘পৃথিবীতে কেবল একটি ভালো আছে তা জ্ঞান, আর কেবল একটি খারাপ আছে তা অজ্ঞতা’।

অসংখ্য মানুষ তাকে পছন্দ করলেও কিছু মানুষ তাকে অপছন্দ ও ঘৃণা করতো।এদেরই একজন গণতান্ত্রিক নেতা এনিতাস।যিনি এলসিবাইডিস ও ক্রিটিয়াস এর মতো ব্যাক্তি যারা একই সাথে সক্রেটিসের শিষ্য ও দেশদ্রোহী হিসেবে সর্বজন বিদিত, তাদের উদাহরন টেনে সক্রেটিসের বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগ আনে।তিনি নাকি এথেন্সের তরুনদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে এবং দেবদেবীর বিরুদ্ধে সবাইকে উস্কে দিচ্ছে!!!এ মামলায় ৫০০জন বিচারকের উপস্থিতিতে সক্রেটিসের মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষনা হয়।

তার বিখ্যাত উক্তি-

“আমি যাচ্ছি মরনের দিকে,তোমরা যাচ্ছো জীবনের দিকে;কোনটা ভালো সেটা শুধু ঈশ্বর জানেন”।

তিনি ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের পথের নির্ভীক যাত্রী।তিনি কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি কিংবা অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতেও ব্যকুল হননি।কারন তিনি নিজেই যে ছিলেন সুন্দর জীবনের সন্ধান দাতা।তিনি চাইলেই বিচারে ক্ষমা চেয়ে রায় পল্টাতে পারতেন কিংবা বন্ধু ক্রিতোর সহায়তায় ‘থেসালিতে’ পালিয়ে যেতে পারতেন।কিন্তু এটি ছিলো তার রীতিবিরুদ্ধ।

যে এথেন্সবাসী সক্রেটিসের বিরুদ্ধে ধর্মবিরোধীতার মামলা করে মৃত্যদন্ডের আদেশ দিলো সেই তিনি মৃত্যুর আগে বন্ধু ক্রিতোকে বলেছিলেন “সুস্থ্যতার দেবতা এসক্লিপিয়াসের কাছে একটা মুরগীর মানোত ছিলো,তুমি শোধ করে দিও।” এছাড়াও মৃত্যুর আগের রাতে স্ত্রীসহ দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করেছেন।পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানীর হেমলক পানের মধ্য দিয়ে পাঠক হৃদয়ের শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে হেমলকের নীল ছোবল।

বোধ করি লেখকের হেমলকের নিমন্ত্রণ কোনো পাঠকই চাইলেও উপেক্ষা করতে পারবেন না।

বি. দ্রঃ বইটি বড় হলেও চোখের নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো।ছন্দপতনের কোনো সুযোগ ছিলোনা,কেননা ঘটনা গুলো চোখের সামনে ভাসছিলো।আগে পড়ে আসা অনেক কথা পরে এমনভাবে টাই আপ করা হয়েছে যেনো এগুলো মেলাতে লেখককে রীতিমতো গবেষণা করতে হয়েছে।একটিমাত্র বইয়ে এরকম সাবলীলভাবে সক্রেটিসকে বাধা আমার মনে হয় বাংলা সাহিত্যে প্রথম।

এর আগে সক্রেটিস বিষয়ক বইয়ে সম্ভবত পড়েছিলাম সক্রেটিসের বাবা সফ্রোনিকাস,সক্রেটিসের জন্য শিক্ষক দিয়ে কাব্য ও শরীরচর্চার ব্যবস্থা করেছিলেন।সক্রেটিস গায়ে স্বল্প বস্ত্রের পাশাপাশি পায়ে স্যান্ডেল পড়তেন।তার দুই বধূ জেনথিপির এক ছেলে ও মিরতোর দুই ছেলে।

এবইটির মাধ্যমে অনেকগুলো তথ্য সংশোধিত হলো।

// নিলয় প্রামাণিক, চিকিৎসক

 


‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’-পাঠ প্রতিক্রিয়া ।। দেবাশীষ রায়

সাপ্তাহিক ছুটির দুই দিনে মন্ত্রমুগ্ধের মত উপন্যাস টি পড়লাম। অসাধারণ শব্দ চয়ন, সহজ সরল ভাবে বইটা উপস্থাপনের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ  Sujan Debnath দাদাকে। গত বইমেলায়  গিয়ে দাদাকে টেক্সট করেছিলাম বই বের হয়েছিল কিনা কিন্ত হতাশ হয়ে ফিরে আসি! এবার বই মেলায় আসা  হয়নি কিন্তু অনলাইনে বইটা নিয়েছি। 

গ্রিক মিথলজির উপর অনেক মুভি দেখেছি কিন্তু কোন বই পড়া হয়ে উঠেনি..। হোমারের মহাকাব্য  ইলিয়াদ ওডিসি  নিয়ে যেভাবে লিখেছেন তেমনি উপমহাদেশের রামায়ণ মহাভারত এই দুই মহাকাব্য নিয়েও  লিখবেন সেই আশা করছি…..ভাল থাকবেন দাদা এই প্রার্থনা করি ঈশ্বরের কাছে!

// দেবাশীষ রায়

 


‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’-পাঠ প্রতিক্রিয়া ।। তড়িৎ কান্তি

আমাদের ভালোবাসার বার্ষিকী হবে চার বছর পর পর.. –Sujan দাদা..

এবার অমর একুশে বইমেলায় দাদার প্রথম বই ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ এসেছে..

“সাহিত্য, ট্রাজেডি ও কমেডি নাটক, বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণতন্ত্র, দর্শন, চিকিৎসা শাস্ত্র কিভাবে শুরু হলো, কারা শুরু করলো- সেটি নিয়ে এই চমৎকার উপন্যাসকে ঘিরে পাঠকদের উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। লেখক সুজন দেবনাথ বিজ্ঞান, দর্শনের মতো জটিল বিষয়কে সুখপাঠ্য একটিমাত্র গল্পে নিয়ে এসেছেন। হাসি-কান্নার মিশেলে চমৎকার গল্পে পুরো গ্রিসের ক্ল্যাসিকাল সময়কে তুলে ধরেছেন। তার এই মুন্সীয়ানা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। বইয়ের নামটিও বেশ মনে ধরার মতো। একবার শুনলেই মনে থাকে। সক্রেটিস হেমলক নামের বিষ পান করে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, সেটি থেকেই বইয়ের নাম ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’।”

// তড়িৎ কান্তি

 


 

On “Hemloker Nimontron” ।। S K Habibullal

whom I thought an angel appeared beholding my drowsy eyes in a hospital bed  in Athens, Greece at 11.30 pm on 8 /8/19 where I was adrift in the sea of despondency, as I was alone there. But day before yesterday he came as a man in my residence to give his written book “Hemloker Nimontron”. He is Sujan Debnath. My pic is with him who has left Bangladesh today. It’s reported that this book so far published all are sold out in the book fair. Bravo writer Sujan Debnath. We are craving for 2and publication & next volume retouching Aristotle, Alexander the great & others।

// S K Habibullal


 

হেমলকের এর খোঁজে বইমেলায় ।। শুভাগত সৌমেন পাল

বই মেলার শেষ দিন এবং লিপ ইয়ার হিসেবেও আজ ছিলো  বিশেষ একটি দিন। এবার দ্বিতীয় দিনের মতো গতকাল বেশ কিছু সময় মেলায় ঘুরে ঘুরে বই সংগ্রহ করলেও প্রিয় একজন লেখকের অটোগ্রাফসহ বই সংগ্রহের আক্ষেপটা মনের কোণে রয়ে গিয়েছিলো উনাকে স্টলে পাইনি বলে। তাই আজ মেলায় আবারো ছুটে যাওয়া! বলছিলাম গ্রিস বাংলাদেশ দূতাবাসে কনস্যুলার হিসেবে কর্মরত Sujan Debnath দাদার কথা। গ্রিসের ক্ল্যাসিকাল সময় নিয়ে কয়েক বছরের গবেষণায় প্রাচীন গ্রিক কাহিনীসূত্রকে একসাথে গেঁথে উপস্থাপন করেছেন  “হেমলকের নিমন্ত্রণে’তে!

লেখকের কথা মতে,”সেই সক্রেটিসের সময় থেকে যারাই জ্ঞানের জন্য আত্মনিয়োগ করেছেন, তারাই কোন না কোনভাবে ভয়াবহ বিপদে পড়েছেন। তাদের জন্য অজান্তেই প্রস্তুত হয়েছে এক পেয়ালা হেমলক। যারা অজানাকে জানতে চেয়েছেন, তারাই হেমলকের নিমন্ত্রণ পেয়েছেন।” আর আমিও তাই  হেমলকের নিমন্ত্রণ গ্রহন করে এক গামলা হেমলক নিয়ে বসে পড়লাম!

// শুভাগত সৌমেন পাল

*******

 


 

হেমলক কিনতে বইমেলায় ।। সত্যজিৎ চন্দ   

…যখন পাঠ্যবই ব্যাতীত একটু একটু অন্য বই পড়া-শোনা করা শুরু করি মনোজগতে গ্রীস সম্পর্কে অনেক ভাবানা উঁকি দেয়।জ্ঞানরাজ্যের আলোড়নকারী ব্যাক্তিবর্গ-এরিস্টাটল,

সক্রেটিস,প্লেটো,আলেকজেন্ডার,হেরোটোডাস,সফোক্লিস,পেরিক্লিস,হিপোক্রাটিস প্রমুখ সবাই যেন এক একটা আলোরবাতি যাদের জন্ম গ্রীসে ফলশ্রুতিতে গ্রীকরা হয়ে উঠল ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, শাস্ত্র,চিকিৎসা, কলা, নীতিশাস্ত্র, গনতন্ত্র,নাট্যকলা,স্থাপত্যবিদ্যার কেন্দ্রবিন্দু।

 দাদার লেখনীর মাধ্যমে তাদের সম্পর্কে অনেক অজানাকে জেনেছি।অধীর আগ্রহে ছিলাম

তাই হেমলকের নিমন্ত্রণে ঘরে বসে থাকাটা নির্বুদ্ধিতার কাজ।

গতবার দাদার সাথে দেখা করতে পারিনি তাই দাদাকে বইমেলায় পেয়ে আরও ভাল লাগল,  আশাকরি হেমলকপ্রেমীরা আর দেরি করবে না।বইটিতে গল্পাকারে তুলে ধরা হয়েছে সেইসব কাহিনী যা আমাদের অজানাকে জানতে আরও তৃষ্ণা বাড়িয়ে দেয়।

// সত্যজিৎ চন্দ          

 


 

জ্ঞানের জন্ম-ইতিহাস নিয়ে সুজন দেবনাথ এর অনন্য এক উপন্যাস ।। সবুজ সফিকুল বাবু

অত্যন্ত সুলেখক ঔপন্যাসিক সুজন দেবনাথ

গ্রীস বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব। সুজন দাদার মতো মানুষ পৃথিবীর যেখানেই যাবে সে দেশ থেকে আমাদের এমন দারুণ দারুণ বই উপহার দেবে যেমনটি  গ্রীসে  অবস্থানের সুবাদে আমরা পেলাম ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ 

আজ বইটি সংগ্রহ করলাম শ্রদ্ধেয় প্রিয় বড় ভাই লিসবন সিটি কাউন্সিলর জনাব রানা তাসলিম উদ্দীন ভাইয়া ও আমি।

সাহিত্য, ট্রাজেডি ও কমেডি নাটক, ইতিহাস, গণতন্ত্র, বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র– এসবের জন্ম-ইতিহাস নিয়ে সুজন দেবনাথ এর অনন্য এক উপন্যাস।

অনেক জানার আছে দার্শনিক সক্রেটিসের ও প্রাচীন সভ্যতার দেশ গ্রীসের অনেক কিছুই বাস্তবিক ভাবে এখন জানবো হেমলকের নিমন্ত্রণ বইটি পড়ে।

লেখক সুজন দেবনাথ দাদার জন্য অনেক শুভ কামনা রইলো আশা করি আগামীতেও এমন অনেক ভালো ভালো বই উপহার দেবে।

// সবুজ সফিকুল বাবু


 

 

বইটি অনলাইন থেকে সংগ্রহের জন্য নিচের লিংকে ক্লিক করুন