Select Page

কাল বিকেলে এথেন্সের কিফিসস নদীর পাড়ে কিছুক্ষণ বসলাম। ইউরোপের নদীগুলোর সামনে দাঁড়ালে ওগুলোকে নদী বলতে আমার কষ্ট হয়। আমাদের বাংলাদেশী চোখে নদী মানে পদ্মা-মেঘনা। নদী মানে অসাধারণ কিছু। তার পার-কিনার দেখা যায় না, তার ঢেউগুলো নিজেই শব্দ করে জানিয়ে দেয় – বুঝেছ, আমি বিদ্রোহী পদ্মা – আমার সাথে ভুংভাং করো না; কিংবা আমি কিন্তু প্রেম-যমুনা, আমার ঘাটে জল নিতে এসে উদাস হয়েছ – ‘কাদের কুলের বউ গো তুমি, কাদের কুলের বউ – কলসী তোমার যাবে ভেসে লাগলে প্রেমের ঢেউ’।

সেই চোখে ইউরোপের নামডাকওয়ালা নদীগুলো দেখলে, প্রথমে বিশ্বাস হয় না – এই কি সেই নদী? এতো ছোট্ট? ইউরোপ হোক, আর যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়া – সব খানেই বিখ্যাত নদীগুলো দেখে আমি যার পর নাই অবাক হয়েছি। বেশির ভাগই আমাদের ছোট ছোট খালের মত – দুই একটাকে একটু বড় খাল বলা যায়। অবশ্য আমাজন আর নীল নদ আমি এখনো দেখিনি। যাই হোক, লন্ডনের টেমস নদী দেখে সুরসিক সৈয়দ মুজতবা আলীর নাকি মনে হয়েছিলো, এই ছোট্ট খালটা কি টেমস নদী? এইজন্যই ইউরোপীয়ানদের নদী নিয়ে কোন আধ্যাত্মিকতা নেই। এই নদী দেখে কারো ভব নদীর কথা মনে হয় না। আমাদের দেশে মানুষ যেমন পরপারে যাবার কথা মনে করে ‘পার করো’, ‘পার করো’ হা-হুতাশ করে, তেমনটা ইউরোপে নেই।

হুম, আমাদের দর্শনে নদী মানে ভবনদী। আমার সংস্কৃতিতে নদীর সাথে আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ট। আমায় মনে পড়ে, ছোটবেলায় আমার দাদু ভবনদী পার হবার ইচ্ছা প্রকাশ করে মাঝে মাঝেই গেয়ে উঠতেন –
‘কোনদিনে খুলিবে নৌকা, মাঝি, আমারে তাই কইও
পিছনে পড়ে যাই যদি – আমায় সঙ্গে করে নিয়ো …
তোমার ময়ূরপংখী নৌকা বেয়ে – পার করিয়ে নিও
পেছনে পড়ে যাই যদি – আমায় সঙ্গে করে নিও

একেবারে সহজ কথা। কিন্তু তীব্র আবেগী সুর দিয়ে অন্তরে আঘাত করে। এটি কবি গান। কবিয়াল বিজয় সরকারের গান। সেই ছোট বেলায় শোনা সুরটা আজো কানে বাজছে। ‘পেছনে পড়ে যাই যদি – আমায় সঙ্গে করে নিও’ – এর চেয়ে আবেগ মাখা আধ্যাত্মিক সুর আমি আর শুনি নি।

কবি গানের শিল্পীরা আসরে বসে বসে গান রচনা করতেন, সেখানে বসেই সুর দিয়ে গাইতেন। মানুষের সাথে সরাসরি এক আসনে বসে তাঁদেরকে মানুষের কথা বলতে হতো। একেবারে হৃদয়ের কথাগুলোকে ছেনে ছেনে মাটির সুরে গাইতে হতো। এজন্যে কবিগানগুলি শ্রোতাকে জড়িয়ে ধরে, একবার শুনলেই হৃদয়ে বসে যায়।

ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে কোন গায়ক আসলে, দাদুর একটাই দাবি ছিলো – তাঁকে ‘বিজয় বিচ্ছেদ’ শুনাতে হবে। গায়ক বেচারাও দেখতাম খুবই খুশি, অমন পুরুনো দিনের গান করতে তাঁকে মনে হয় তেমন কেউ অনুরোধ করতো না। তিনি হেসে ফেলতেন। বেচারা হাসি হাসি মুখ করে শুরু করতেন দুঃখের গান। বিজয় সরকার ছড়িয়ে পড়তো আমাদের ঢেঁকি ঘরের বারান্দায় – ‘তুমি জানো নারে প্রিয় – তুমি মোর জীবনের সাধনা’ কিংবা
‘এই পৃথিবী যেমন আছে তেমনি ঠিক রবে,
সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে’।

গাইতে গাইতে গায়কের হাসিমুখ একসময় কষ্টে ভরে উঠতো, এক সময় তিনি কেঁদেই ফেলতেন। সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার কষ্টে দাদুও গায়কের সাথে কেঁদে উঠতেন। এই কান্নাই তাঁর বিজয়-বিচ্ছেদ শোনার সার্থকতা। কিন্তু ওনারা কেন কাঁদছেন, আমি ঠিক বুঝতাম না। তবু বেয়াদবি যেন না হয়, সেজন্য দুঃখ দুঃখ মুখ করে ঢেঁকির উপর বসে থাকতাম। মনে মনে ভাবতাম, যে গান অনুরোধ করে নিজের ইচ্ছায় শুনে আমার দাদু কাঁদছে কিংবা কাঁদার জন্যই যেই গান শুনতে মানুষ অনুরোধ করে, সে গানের মাহাত্ম্য নিশ্চয়ই অনেক বড়। ভাবতাম – তাইলে আমিও একদিন কবি গান গাইব – একদিন বিজয় সরকার হব।

বিজয় সরকার নড়াইল অঞ্চলের লোক। বিশ শতকের একটা দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সারা বাংলা ঘুরে ঘুরে কবি গান করতেন। গায়ক আব্বাস উদ্দীন, কবি জসীম উদদীনরা ছিলেন বিজয় সরকারের বন্ধু। কবি জসীম উদদীন বড় ভালোবাসতেন বিজয় সরকারের গান। তিনি নাকি একবার বিজয় সরকারকে বলেছিলেন, আমি মারা যাওয়ার আগে আপনার একটা গান শুনতে চাই – ‘পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনী একদিন ভাবি নাই মনে’।

থাক, ওই গান কবি জসীম উদদীন শুনুক। আমার এতো তাড়াতাড়ি পোষা পাখি উড়ে যাবার কথা মনে করার দরকার নেই। কাল নদীর তীরে বসে এই লেখাটার কথা মনে করেছিলাম। নদী নিয়ে বিজয় সরকারের সেই গানটা দিয়েই শেষ করি –
‘যদি অন্ধকারে পথ ভুলে যাই – পথ দেখায়ে দিও
পিছনে পড়ে যাই যদি – আমায় সঙ্গে করে নিয়ো’।

পেছনে পড়ে গেলে, নিশ্চয়ই তিনি হাত বাড়াবেন।
……………………………………………………………………………
// পিছনে পড়ে যাই যদি – আমায় সঙ্গে করে নিয়ো //© সুজন দেবনাথ