শান্তিনিকেতনের শান্তিভূত -২

/, ভ্রমণ/
শান্তিনিকেতনের শান্তিভূত -২

শান্তিনিকেতন চালু হয়েছে দুটি ছাতিম গাছ থেকে। ছাতিম গাছ না থাকলে কোনদিন শান্তিনিকেতনের জন্মই হতো না।
ছাতিম খুবই সুন্দর বৃক্ষ। শুধু সুন্দরই নয়, ছাতিম খুবই প্রেমিক বৃক্ষ। ফুলে ভরা এই গাছ যে দেখে, সেই এর প্রেমে পড়ে। তবে মানুষের চেয়ে ভূত-পেত্নীরা নাকি আরো বেশি করে এর প্রেমে পড়ে। তাই যেখানেই ছাতিম গাছ আছে, সেখানে নির্ঘাৎ দু-একটা ভূত থাকবেই। এই ভূতের কথা আমি ছোটবেলা থেকেই শুনছি। সেসময় আমাদের বাড়ির উত্তর কোনে একটা বড় ছাতিম গাছ ছিলো। আমাদের ফরিদপুর, বিক্রমপুরে এই গাছকে বলে ছাইতান গাছ। ছোটবেলায় জানতাম আমাদের বাড়িতে অবশ্যই ভূত আছে, আর সেই ভূত থাকে ঐ ছাইতান গাছটাতেই। দুপুর বেলা ভয়ে কেউ ঐ গাছের নিচে যেতাম না।

শুধু গ্রামে-মফস্বলেই না, একেবারে খোদ লন্ডনের মানুষও জানে যে ছাতিম গাছে ভূত থাকে। তাই ইংরেজরা এই গাছকে বলে ‘ডেভিলস ট্রি’। মোট কথা ছাতিম গাছেই ভূত থাকবেই। তো বোলপুরের ভুবনডাঙার ছাতিম গাছেও একটা ভূত ছিলো। সেই ভূতটার নাম শান্তিভূত।

একদিন ঘটনাচক্রে ‘ডেভিলস ট্রি’ বা ছাতিম গাছের তলায় আসলেন রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি যাচ্ছিলেন তার বন্ধু রায়পুরের জমিদার ভুবন সিংহের বাড়ি। পথে বিশ্রাম নিতে থামলেন ভুবনডাঙায়। জমিদার ভুবন সিংহের নাম থেকেই জায়গাটির নাম ছিলো ভুবনডাঙা। দেবেন্দ্রনাথ ভুবনডাঙার ছাতিম গাছের নিচে বসলেন। আর সেই গাছের শান্তিভূত তাকে ধরে ফেললো। তিনি শান্তি পেতে শুরু করলেন। চারদিক থেকে শান্তি তাকে ঘিরে ধরলো।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ঋষি টাইপের মানুষ। ব্রাহ্মরা তাকে বলতো মহান ঋষি বা মহর্ষি। তো মহর্ষি ছাতিম গাছের নিচে বসতেই শান্তিতে তার মন, প্রাণ, আত্মা সব জুড়িয়ে গেলো। মনে হলো – প্রার্থনা করার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না। তিনি চোখ বুজে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তিনি আমার প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি’। তো এতো শান্তি পেয়ে তিনি তখুনি স্থির করলেন, এখানে ব্রাহ্ম সমাজের একটা মন্দির বানাবেন।

জমিদার বন্ধুকে জানালেন সে কথা। জমিদার বলল, যতদুর তোমার চোখ যায়, ততদূর আজ থেকে তোমার। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ বিনামূল্যে কিছু নিবেন না। তখন বহু মুলামুলি আর ঝুলাঝুলির পর জমিদার বাবু ১ টাকায় ২০ বিঘা জমি দিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। সেই জমিতে বাড়ি বানিয়ে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বাড়িটির নাম দিলেন শান্তি নিকেতন। আর তার পুত্র রবীন্দ্রনাথ দিনে দিনে সেটিকে বানিয়ে ফেললেন একটি সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর।
ভাগ্যিস সেদিন দেবেন্দ্রনাথকে শান্তিভূতে ধরেছিলো। তো শান্তিভূতের দেখা পেতে আমরা রওয়ানা করলাম। কলকাতা থেকে ট্রেনে বোলপুর।

(চলমান)
………………………………….
@সুজন দেবনাথ// অব্যয় অনিন্দ্য

2020-03-23T16:13:29+06:00 November 2nd, 2018|Categories: ফিচার, ভ্রমণ|0 Comments

Leave A Comment