হেঁটেছি সাত-পা : বুঝে না বুঝে

//হেঁটেছি সাত-পা : বুঝে না বুঝে

হেঁটেছি সাত-পা : বুঝে না বুঝে

সুজন দেবনাথ: ‘সবাই সমান ভালবাসতে পারে না। প্রেমের ক্ষেত্রেও প্রতিভার প্রয়োজন আছে। খুব বড় শিল্পী বা গায়ক যেমন পথেঘাটে মেলে না, খুব বড় প্রেমিক প্রেমিকাও তেমনি পথেঘাটে মেলে না। ও প্রতিভা যে কোন সৃজনী প্রতিভার মতই দূর্লভ। এ কথা সবাই জানে না, তাই যার কাছে যা পাবার নয় তার কাছে তাই আশা করতে গিয়ে পদে পদে বিপদে পড়তে হয়।’ কথাটা বিভূতিভূষণ বলেছিলেন, ‘দৃষ্টি প্রদীপ’ উপন্যাসে।

এই প্রেমের প্রতিভা কোন কালেই আমার ছিল না। আমি নিজে এটা জানতাম না। আমার প্রেমিকারাও জানত না। তাই বিনা নোটিশে একের পর এক ক্রাশ খেয়ে গেছি। তুমুল প্রেম গিগামাইল বেগে আসত। আমাকে নিয়ে দৌড়াত। দৌড়ে আমি কোনদিনই জিততে পারি না। নিয়ম মতই একদিন আমার হাতে হারিকেন। প্রেমও নেই, প্রেমিকাও নেই।

অবশেষে ২০০৫ সাল। এবার প্রেম আস্তে আস্তে এল। আগের মত আর গিগামাইল বেগে নয়। আরও একটা বিষয় নতুন ছিল। এবার প্রেমের প্রতিভা আমারো নেই, প্রেমিকারও নেই। কেউই জানি না কী করে ম্যানেজ করতে হয়। তাই শুরু হল তুমুল আনম্যানেজড ঝগড়া। একেবারেই হুদাহুদি। অকারণ, অন্যায় রাগারাগি। তবে আগের প্রেমগুলোর মত গতিবেগ না থাকায় একেবারে থেমে যায়নি। সেই না–জানা, না-বোঝা ঝগড়া চলছে তো চলছেই।
একদিন পেছন ফিরে দেখি – সাত বছর হয়ে গেছে। শাস্ত্রে নাকি আছে – মন বিনিময় করে একসাথে সাত পা হাঁটলে আর ফেরা যায় না। তারাশংকরের ‘সপ্তপদী’তে কৃষ্ণেন্দু এজন্যেই আর ফিরতে পারেন নি। রিনা ব্রাউন ফিরিয়ে দিলেও কৃষ্ণেন্দু মনে করেছিলেন-তিনি আসলে সাত পা হেঁটে ফেলেছেন। তাই রিনাকে না পেলেও ফেরা যাবে না। তো ঈশ্বরই হোক কৃষ্ণেন্দুর ভালোবাসা। কৃষ্ণেন্দু ঈশ্বর পেয়েছিলেন। আর আমি তো সাত পা নয়, তখনই সাত সাতটি বছর হেঁটে ফেলেছি। কী আর করা – ফেরার উপায় নেই, সাত পাকে বাঁধা পড়লাম। সবাইকে দেখিয়ে একসাথে সাত পা হাঁটলাম।

বিয়ের আসর। প্রতীকীভাবে গোল গোল সাতটা চিহ্ন আঁকা। প্রতিশ্রুতি দিতে দিতে একসাথে সেই সাতটা বৃত্ত পার হতে হবে। মানে সাত পা হাঁটতে হবে। হাঁটার সময় পুরোহিত সংস্কৃতে প্রতিশ্রুতি বলে গেলেন। আমি অর্ধেক বুঝলাম। অর্ধেক বুঝলাম না। যেই অর্ধেক বুঝলাম, তাতেও মনে হল – প্রতিশ্রুতিগুলো ঈশ্বরের কাছে যতটা, স্বামী-স্ত্রী নিজেদের কাছে ততটা নয়। মনটা খচখচ করতে লাগল। রাতে প্রেমিকাকে জিজ্ঞেস করলাম প্রতিশ্রুতিগুলি সে বুঝেছে কিনা। সে মাথা নিচু করে আছে – কিছু বলছে না। সাত বছর পরে এই লজ্জা দেখে আমি মনে মনে হাসলাম। মনে হয় বাংলার সকল নতুন বধুর একটাই রঙ – লাজরঙ, লজ্জাবর্ণ। সাত বছরের প্রেমও সেটা দূর করতে পারে না। হঠাৎ শুনলাম আধোফোটা একটা স্বর – ‘কিছু প্রতিশ্রুতির ভাষা আজও আবিষ্কার হয়নি। তাই বুঝা যায় না, বুঝলেও বলা যায় না, বললেও তা শুনা যায় না – কারণ কথাগুলো তো স্বরতন্ত্র থেকে আসে না, আসে হৃদয় থেকে।’

সাত বছরের চেনা মেয়েটাকে হঠাৎ অচেনা মনে হল। কী জানি, সেদিন হয়তো হঠাৎ করে মেয়েটা প্রেমের ক্ষেত্রেও প্রতিভাবতী হয়ে ওঠেছিল। তাই চিনতে কষ্ট হচ্ছিল।
আর আমি? আমিতো রবি ঠাকুরের তথৈবচ। আমার ওই প্রতিভা কোনদিনই ছিল না, হবেও না। সবার কাছে সব কিছু আশা করতে নেই।

লেখক ঃ  ফাস্ট সেক্রেটারী, বাংলাদেশ দূতাবাস, এথেন্স, গ্রীস

2018-11-05T15:59:50+06:00 July 19th, 2018|Categories: সাহিত্য কর্নার|Comments Off on হেঁটেছি সাত-পা : বুঝে না বুঝে