শান্তিনিকেতনের শান্তিভূত -৩

/, ভ্রমণ/শান্তিনিকেতনের শান্তিভূত -৩

শান্তিনিকেতনের শান্তিভূত -৩

শান্তিনিকেতনের পথে যাত্রা শুরু করলাম। কলকাতা থেকে ট্রেনে বোলপুর। ট্রেনের নামও শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস। ট্রেনের কামরায় রবীন্দ্রনাথ আর মহাত্মা গান্ধীর ছবি ঝুলছে। পাশের কক্ষে কয়েকলাইন রবীন্দ্রনাথের গান। সবকিছু বলছে- চলো, রবীন্দ্রভুবনে।

মাঝে বিরতিতে ট্রেনে উঠলো এক বাউল। গেরুয়া বসন, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। গাইতে শুরু করলো – ‘লোকে বলে বলে রে, ঘর বাড়ি ভালা না আমার, কি ঘর বানাইমু আমি শুন্যেরও মাঝার…’। হাসন রাজার গান। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনছে। অনেকেই মাথা দুলাচ্ছে। আমি যাত্রীদের দিকে তাকালাম – এসি কামরার যাত্রীরা সবাই অবস্থাপন্ন। এদের ঘর-বাড়ি অবশ্যই ভালো। অথচ বাউল গাইছে – … ‘ঘর-বাড়ি ভালো না আমার’। এই গান এদের কারো জীবনের সাথেই মিলে না। তবুও সবাই ভাবছে এ আমারই গান। সবাই বলছে, ঠিকই তো – ‘কি ঘর বানাইমু আমি শুন্যের মাঝার’। বাউল গান এমনই – যার অনেক আছে, তাকেও বুঝিয়ে দেয় – আসলে তোমার কিছুই নেই। হাসন রাজা নিজেও ছিলেন জমিদার। সব থেকেও, তার যেন কিছুই নেই। মনে মনে আমরা আসলে সবাই বাউল। এই মুহূর্তে আমার সামনে এক ট্রেন বাউল।

কলকাতার ট্রেনে হাসন রাজার গান শুনে মনে পড়লো – একটা সময় কলকাতার মানুষ পূর্ব বাংলার শুধু দুইজন বাউলের কথা জানত – লালন আর হাসন রাজা। কারণ শুধু এই দুই জনের কথাই রবীন্দ্রনাথ তার লেখায় উল্লেখ করেছিলেন। এখানের বুদ্ধিজীবীরা পূর্ব বাংলার মাটির গানের কথা জানতেনই না। তবে দেশ-কালের বিভেদ যে বাউলদের মধ্যে নেই, সেটা এই বাউল ঠিকই বুঝিয়ে দিচ্ছে।

ট্রেনে আড়াই-তিন ঘণ্টার জার্নি। ঠিক দুপুরে পৌঁছলাম বোলপুর। সাথে চৈতি, নিয়ন, আমার মা-বাবা আর চৈতীর মা-বাবা। স্টেশনে আমাদের নিতে এসেছে প্রিয় ছোটভাই গাজী নিষাদ। নিষাদ টাঙ্গাইলের ছেলে, খুব ভালো লেখালেখির হাত, এখন শান্তিনিকেতনে গ্রাজুয়েশান করছে। সাথে এসেছে ওর সহপাঠী বোলপুরের ছেলে অর্ঘ্য। ওরা দুইজনই শান্তিনিকেতনে আমাদের গাইড এবং ট্যুর ম্যানেজার। ওরা যা বলেছে, আমরা নিঃশব্দে তাই করে গিয়েছি।
স্টেশন থেকে বের হয়ে নিষাদ বললো, দাদা, এখানে সবাই এই বাহনে চলাচল করে। এর নাম টোটো।
তাকিয়ে দেখলাম ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা। চৈতী বললো, এটা হলো অটোর ছোট ভাই – সেজন্য টোটো।
টোটোতে করে গেলাম হোটেলে। হোটেলের নাম ভিআইপি গেস্ট হাউজ। নিষাদ আর অর্ঘ্য তিনতলায় তিনটা রুম ভাড়া করে রেখেছে। সেখানে যেতেই চৈতী একটা রুম দেখিয়ে বললো, আমি কিন্তু ঐ রুমটাতেই থাকব। তাকিয়ে দেখি, রুমের নাম চৈতী।
বললাম, ‘অবশ্যই। একদিন চৈতি এখানে আসবে, সেটা জেনেই ওরা
অনেক বছর ধরে এই রুমটার নাম দিয়ে রেখেছে চৈতী। এই রুমে তুমি না থাকলে ওরা আমাদের এখানে থাকতেই দিবে না।’ তো চৈতী নামের কক্ষেই থাকলো চৈতী।
আসলে হোটেলের সব রুমের নাম শান্তিনিকেতনের এক একটা ভবনের নামে। আমাদের তিনটা রুমের নাম – শান্তিনিকেতন, চৈতী আর দেহলী। শান্তিনিকেতনের একটি ছোট্ট ঘরের নামও চৈতী।
বাবা বললো, শুধু ট্রেনেই না, এখানে হোটেলে ঢুকলেও বুঝতে পারবে যে, তুমি রবীন্দ্রভুবনে এসে গেছো।

হোটেলে আসতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। দুপুরের খাবার খেতে নিষাদ আমাদের নিয়ে গেলো খোয়াই বনে। শান্তিনিকেতনের পেছনের দিকে এই বনে লাল লাল মাটিগুলো খয়ে খয়ে যায়। তাই রবীন্দ্রনাথ এর নাম দিয়েছিলেন খোয়াই। খোয়াইয়ের বনে আছে অসংখ্য লম্বা লম্বা আকাশমনি গাছ। এই গাছের সোনালী রঙের বড় বড় মঞ্জরী অনেক উঁচু হতে ঝুলে থাকে। সেটা দেখে রবীন্দ্রনাথ এই গাছের নাম দিয়েছিলেন সোনাঝুরি। এজন্য এই খোয়াই বনকে সোনাঝুরি বনও বলে। প্রতি শনিবার এই বনে হাট বসে। স্থানীয় সাঁওতালরা নিজেদের বানানো সুন্দর সুন্দর জিনিস নিয়ে আসে হাটে। সেই সাথে সাঁওতালদের নিজস্ব নাচও হয়। আমার গিয়েছিলাম শুক্রবার। তাই হাট দেখতে পাই নি। খোয়াই বনের ভেতরের রেস্টুরেন্টেই দুপুরের খাবার খেলাম। রেস্টুরেন্টের নাম রাম-শ্যাম ভিলেজ রিসর্ট।

খোয়াই থেকে গেলাম রবীন্দ্রনাথের ‘আমাদের ছোট নদী’ নদীটি দেখতে। নদীটির নাম কোপাই। আসলেই অনেকগুলো বাঁক নদীটিতে। সামনে গেলে মনে হবে এই নদী দেখে ‘… চলে বাঁকে-বাঁকে ’ কথাটা মাথায় আসা খুবই স্বাভাবিক। নদীর সামনে গিয়ে নিয়নকে বললাম, দেখো, এই সেই ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’। কবিতাটা নিয়নের কমন পড়েছে। সে হেসে বিজ্ঞের মত বললো, ওহ, এটা। ভাবটা এমন যেন কবিরা কিভাবে কবিতা লিখে, সেটা সে এইমাত্র বুঝে ফেলেছে।
কোপাই নদীর উল্টাপাড়ে বড় বড় কিছু তাল গাছ। এগুলো দেখেই নাকি কবি লিখেছিলেন ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’ কবিতাটি। তিনি এই জায়গার নাম দিয়েছিলেন তালঝুরি।
তালঝুরি থেকে যাব শান্তিনিকেতনের মূল ক্যাম্পাসে।

[চলবে]
@ সুজন দেবনাথ// অব্যয় অনিন্দ্য

2019-01-05T23:07:15+06:00 November 5th, 2018|Categories: ফিচার, ভ্রমণ|Tags: , |Comments Off on শান্তিনিকেতনের শান্তিভূত -৩