বিসিএস পরীক্ষার ক্যাডার চয়েস

//
বিসিএস পরীক্ষার ক্যাডার চয়েস

বিসিএস পরীক্ষার ক্যাডার চয়েস

বিসিএসের সার্কুলার হলেই ক্যাডার চয়েস নিয়ে ছোট ভাইবোনদের প্রশ্ন আসতে থাকে। তাই নতুনদের জন্য পুরুনো লেখাটি আপডেট করলাম। এটি কোন পণ্ডিতি লেখা নয়। একজন নতুন বিসিএস পরীক্ষার্থী যেভাবে ভাবে, যেভাবে আমাকে প্রশ্ন করে, সেগুলোর উত্তর দিতে লেখা। এখানে ক্যাডারগুলোর তথ্য দিচ্ছি, সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকেই –

এডমিনঃ ১ম কথা হল, ৯০% সচিব এডমিন থেকে হয়। শুধু পররাষ্ট্র সচিব ছাড়া সকল সচিবই এডমিন থেকে নিয়োগের ইতিহাস আছে। বর্তমানে কয়েকজন মাত্র সচিব অন্য ক্যাডারের। তাই যারা ভবিষ্যতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে চান তাঁদের জন্য এডমিন ভাল চয়েস। প্রথমে একটি ডিসি অফিসে কাজ করতে হবে সহকারী কমিশনার হিসেবে। ২/৩ বছর সময়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা AC(Land) এর দায়িত্ব পাবেন। এরপর ইউএনও,এডিসি, ডিসি। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়েও সহকারী সচিব, উপসচিব… হিসেবে অনেকে কর্মরত থাকেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পোস্টিং হয়। তাই এডভেঞ্চার আছে, এটা এনজয় করতে পারলে ভাল লাগবে। মানুষের সাথে সরাসরি কাজ। তাই সত্যি যদি আপনার ইচ্ছা থাকে, মানুষের জন্য কাজ করবেন – সে সুযোগ এখানে আছে। জুডিশিয়াল সার্ভিস আলাদা হওয়ার পরে এডমিন ক্যাডার নিয়ে অনেক নেগেটিভ কথা শুনা গেছে। বিশেষত আমরা যখন জয়েন করি, তখনই বিষয়টা শুরু হইছিল। তাই অনেকের মাঝে হা-হুতাশ ছিল। এখন কিন্তু সেটা শুনা যায় না তেমন। তখন ভাবা হচ্ছিল মেজিস্ট্রেসি বলতে কিছুই আর এডমিন অফিসারদের থাকবে না। আসলে তো তা নয়। যে কোন দেশেই শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এডমিন অফিসারদের বিকল্প নেই। একজন নন-আর্মড অফিসার অর্ডার করবে, আর আর্মড-পার্সনরা সেটা পালন করবে। এটাই যে কোন সভ্য দেশের নিয়ম। তাই এখন সরকারের প্রয়োজনে সহকারী কমিশনারগণ নিয়মিতই ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্ব পালন করেন। মোবাইল কোর্টসহ অনেক দায়িত্বই আপনি পাবেন। মাঝে কিছু বছর এই ক্যাডারে পদোন্নতি স্লো ছিলো-এখন সেটা নেই।
.
পুলিশঃ পুলিশকে সবার প্রয়োজন। তাই সরকারী চাকরি করে পরিচিতজনের কাছে কেন্দ্রবিন্দু হবার সৌভাগ্য এখন পুলিশেরই সবচেয়ে বেশী। যে যাই বলুক, আপনার মোবাইল নাম্বারটা সবার আকাঙ্ক্ষিত হবেই। আর এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাও পুলিশ ক্যাডারদের পক্ষে সম্ভব। কাউকে সরাসরি বিপদ থেকে রক্ষা বা আইনি সহায়তা তাঁদের হাতেই। তাই যারা মানুষকে সরাসরি সাহায্য করতে চান, তাঁদের জন্য পুলিশ হওয়াই আমাদের দেশে সবচেয়ে উপযোগী। আর এই সৌভাগ্যের সাথে ঝুঁকির কথাও একটু মাথায় রাখুন। রাজনৈতিক সমস্যা থেকে শুরু করে আইনগত সকল সমস্যা পালনের জন্য ঝুঁকি নেবার সাহসটুকু থাকতে হবে। আর ফিল্ড লেভেলে কাজ করতে নেতা-কর্মীদের ম্যানেজ করে দায়িত্ব পালনের বিষয়টাও আছে। ট্রেনিং শেষে পোস্টিং হলে এএসপিকে সরকারী গাড়ি দেয়া হয় দায়িত্ব পালনের জন্য, যেটা আর মাত্র দু-একটা ক্যাডারে আছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পুলিশ অফিসারদের অনেকেই সুযোগ পায়। এতে বেশ ভাল আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায়, সাথে একটু ঝুঁকি তো আছেই। আবার উপরের লেভেলে পোস্ট কম। তাই উপরে পদোন্নতি একটু স্লো, তবে আমাদের দেশে এসপিই অনেক বড় কিছু, আর তাঁর উপরেরগুলোতো আছেই। মাঝে মাঝে আপনার ব্যক্তিগত কোন দোষ না থাকলেও সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের গালি শুনতে হতে পারে। তবে সেটা আপনার আড়ালে, সামনে পড়লে মোবাইল নাম্বারই নিয়ে নেবে। পুলিশের এএসপিদের অধীনে কনস্টেবল থেকে শুরু করে অনেক পুলিশ সদস্য থাকে, তাই দেশের যেখানেই যাবেন, লজিস্টিক সাপোর্ট থাকবে।
.
অডিটঃ অডিটে সব সময়ই অল্প ক’টা পোস্ট থাকে। আর যেহেতু পোস্ট অল্প, তাই পদোন্নতি দ্রুত। মোটামুটি বিভাগীয় শহরগুলিতেই পোস্টিং। অডিট হচ্ছে অন্যের ভুল, অনিয়ম এসব ধরা। তাই যে অফিসেই অডিট করবেন, বেশ সম্মানই পাবেন।
.
ট্যাক্স এবং কাস্টমসঃ সরকারের রেভিনিউ জোগানের কাজটা এরা করেন। তাই সরকার এদের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। আমার-আপনার বেতনের যোগানের কাজটা এদের মাধ্যমে হয়। প্রমোশান ভালো, পোস্টিং মোটামুটি শহরকেন্দ্রিক, ভালো কাজের জন্য আর্থিক reward আছে। পুলিশের মতই বেহুদা গালি শুনতে হতে পারে মাঝে মাঝে। ট্যাক্সের ব্যাপারগুলো একটু টেকনিক্যাল টাইপের, তাই ট্যাক্স ক্যাডার হলে অনেকেই এ বিষয়ে সহায়তা করতে পারবেন।
.
ইকনোমিকঃ সচিবালয়ে বা পরিকল্পনা কমিশনে অফিস। তাই ঢাকায় পোস্টিং। ইকনোমিক ক্যাডারের অফিসারগণ প্লানিংয়ের কাজ করেন। তাই যারা রিসার্চ রিলেটেড কাজে ইচ্ছুক, তাঁদের জন্য এটা ভাল চয়েস। হয়তো রিসার্চমুখী বলেই ইকনমিক ক্যাডারের অফিসারদের একটা বড় অংশ বিদেশে ডেপুটেশান বা শিক্ষাছুটিতে পড়াশুনা করে। সম্প্রতি ঘোষণা হয়েছে – ইকনোমিক ক্যাডার এডমিনের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। মানে ইকনোমিক ক্যাডাররা এডমিন ক্যাডার হয়ে যাবে। এ ক্যাডারের কাজ প্রোজেক্টের প্লানিং।
.
তথ্যঃ তথ্য ক্যাডারের অফিসারদের কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কাজের সুযোগ আসতে পারে। মন্ত্রণালয়ে মাননীয় মন্ত্রীগণের Public Relations officer (PRO), বিদেশে কয়েকটা দূতাবাসে তথ্য কর্মকর্তা, এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির অফিসেও তথ্য কর্মকর্তা হতে পারেন। তবে এগুলো সাধারণত স্বল্পকালীন হয়।
.
আনসার/রেল/ডাক/সমবায়/খাদ্য/পরিবার পরিকল্পনাঃ এই ক্যাডারগুলোতে কম পোস্ট থাকে, তাই এই ক্যাডারগুলো নিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন কম করে। পোস্ট কম থাকলেও চাকরি হিসেবে এগুলো খুবই ভালো। মানুষের জন্য কাজ করার ভালো সুযোগ আছে। তাই চয়েস থেকে কিছুতেই বাদ দেবেন না।
.
শিক্ষা ক্যাডারঃ এখন প্রায়ই ভাবি, আমি যদি মাঝে মাঝে শিক্ষক হতে পারতাম! টিনএজ ছেলেমেয়েদের পথ দেখানোর মত সুন্দর কাজ আর নেই। শিক্ষকতা সম্মানের এবং উপভোগ্য। শিক্ষকরা রিসার্চ করেন, জ্ঞান নিয়েই চলাফেরা। I really envy teachers.
.
টেকনিক্যাল/পেশাগত ক্যাডারঃ (স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, প্রকৌশল, বন) টেকনিকাল জ্ঞানকে দেশের কাজে বিশেষত সরকারের নীতিমালায় যারা কাজে লাগাতে চান, তাঁদের জন্য সঠিক জায়গা হচ্ছে টেকনিক্যাল ক্যাডারগুলো। আপনার কষ্টার্জিত টেকনিক্যাল জ্ঞানকে দেশের কাজে লাগাতে চাইলে সবচেয়ে ভালো চয়েস হবে এগুলো।
.
পররাষ্ট্রঃ এটাতে আমি চাকরি করি, তাই ঢাক পিটানো হয়ে যাবে কিনা ভাবছি। যাই হোক, ফরেনে চাকরি হলে আপনি সেগুন বাগিচায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দিবেন। শুধু বাসা থেকে অফিসে আসা আর ৫টায় অফিস থেকে বের হতে পারলে বাসায় ফেরা এ দুই সময় অফিসের মাইক্রো পাবেন। দুই বছর পূর্ণ হলে আপনি বিদেশে দূতাবাসে পোস্টিংয়ের জন্য উপযুক্ত বলে ধরা হয়। তবে পোস্টিং হতে ৩ বছরের মত লাগে। কেউ কেউ নিজেই দেরী করে বিদেশে পোস্টিং নেয়। বিদেশে পোস্টিং হলে ফরেন ভাতা আছে। যা পাওয়া যায়, তাতে বিদেশে বিলাসিতা করা যায়না, সংসার চলে। পদোন্নতির সাথে সাথে এলাউন্স বাড়বে। পোস্টিংয়ে থাকা অবস্থায় যে কোন দেশের ডিপ্লোমেটরা ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি কিনতে পারে। তবে গাড়ি দেশে আনতে হলে ট্যাক্স দিতে হবে। অফিসার অল্প, তাই কাজের অনেক চাপ। আবার চাকরিই যেহেতু ফরেনে, তাই বিদেশে ঘুরতে পারবেন। পোস্টিংয়ের আগেও ট্রেনিং, কনফারেন্স ইত্যাদিতে বিদেশে যাবার সুযোগ আসবে অনেকের। তবে পরিবার ফেলে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা কষ্টকরও। আবার এক দেশে পোস্টিং ৩ বছরের জন্য, এরপর অন্য দেশে ৩ বছর, পরের ৩ বছর ঢাকায়। এটা জেনারেল পোস্টিং প্যাটার্ন। এই ঘন ঘন চেঞ্জ নিজের এবং ছেলেমেয়ের জন্য বেশ ঝামেলার। অন্যদিকে ফরেনে অফিসার অল্প বলে পদোন্নতির সুযোগ অন্য চাকরি থেকে ভাল। এতদিন এটা প্রচলিত ছিল যে – ফরেনে জয়েন করলে সে Ambassador হয়ই। ভবিষ্যতে কি হবে জানি না। তবে এখন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি অফিসারই সময় হলে Ambassador হয়েছে। রাষ্ট্রদূত দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে, তাই সম্মান মনে হয় একটু পাবেন। বেশ হোমরা-চোমরা লোকজনের সাথে মাঝে মাঝেই মিটিং সিটিং হবে। তবে দেশে রাস্তাঘাটে আপনাকে কেউ চিনবে না। ফরেন সার্ভিস বিষয়ে সৎ পরামর্শ হলো – ফরেন সার্ভিস ক্যাডার চয়েসে দিলে, প্রথম চয়েস হিসেবেই দিন, না হলে দেয়ার দরকার নেই।
.
ক’দিন আগে কয়েকজন তরুণ সাহিত্যিক কয়েকটা লেখা দিয়ে সমালোচনা করতে বলল। কিন্তু সমালোচনা করার পরে তাঁরা আমার উপর ক্ষেপে গেল। আমি নাকি সবাইরে প্রশংসা করে গেছি। আমার মন্তব্য থেকে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। কী আর করা – খারাপ বলতে মনে হয় একটু বেশি সাহস লাগে। যাই হোক, সেই বিষয়টা মাথায় রেখে, এখানে আমি একজন বিসিএস পরীক্ষার্থী যেভাবে ভাবে, যেভাবে তারা আমামকে প্রশ্ন করেছে, সেভাবেই বিভিন্ন ক্যাডারের কিছু বিষয় দিতে চেষ্টা করলাম। এগুলো শুধুই তথ্য। অন্যদের কথাও শুনুন। এরপর নিজের বিচার দিয়ে ভাবুন – কোন কাজটা আপনি করতে চান। কোনটায় আনন্দ পাবেন। সেভাবেই চয়েস দিন। জব এনজয় না করতে পারলে ক্যারিয়ারকে ভালবাসতে পারবেন না। তাই আনন্দ খুঁজে পাওয়াই হোক চয়েসের ভিত্তি। জনসেবাকে উদ্দেশ্য করে গড়ে উঠুক আপনার সুন্দর ক্যারিয়ার।

অগ্রজের অগ্রিম শুভকামনা

সুজন দেবনাথ (অব্যয় অনিন্দ্য)

2018-11-05T16:17:43+06:00 November 5th, 2018|Categories: ক্যারিয়ার কর্নার|Tags: , |Comments Off on
বিসিএস পরীক্ষার ক্যাডার চয়েস